বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র: দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অর্ধশতাব্দী


April 07, 2022 at 05:09AM
from somoynews.tv | RSS Feed

গত ৪ এপ্রিল বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অর্ধশতাব্দী অতিক্রান্ত হলো। এই বিশেষ দিনটিকে দুই দেশই যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করেছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনের আমন্ত্রণে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন। বিশেষ এই দিনে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আব্দুল মোমেনকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন। ৫০ বছর পেরিয়ে আগামী ৫০ বছরে এই সম্পর্ককে অনন্য উচ্চতায় নিতে দুই মন্ত্রীই দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস এবং ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকেও দিনটিকে বিশেষভাবে পালন করা হয়েছে। বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের নতুন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস তাঁর বিশেষ নিবন্ধে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং মুজিববর্ষের লগ্নে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অর্জনের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক হানাদার বাহিনী কর্তৃক দেশের সেরা বুদ্ধিজীবীদের হত্যার পরও বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়ানোকে অনন্য অর্জন বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের মিল প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের একটি অভিন্ন ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমাদের উভয় দেশ স্বাধীনতার জন্য রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করেছি এবং গণতন্ত্রের প্রতি অগাধ বিশ্বাস দ্বারা ঐক্যবদ্ধ। দুটি দেশই জানে যে গণতন্ত্র একটি প্রক্রিয়া এবং এর কোনো চূড়ান্ত রূপ নেই।


একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে বাংলাদেশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে সমুন্নত রাখার বিষয়ে বদ্ধপরিকর। দুই দেশের মধ্যকার বিগত ৫০ বছরের সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় এটি একটি অন্যতম বড় শর্ত ছিল বৈকি। আমরা দেখি যুক্তরাষ্ট্র বহিঃসম্পর্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে মূলত দুটি উপায় অবলম্বন করে থাকে। প্রথমত, তারা কিছু দেশের সাথে নিজেদের জাতীয় স্বার্থে নিবিড় সম্পর্ক বজায় রেখে চলে। এক্ষেত্রে ঐসব দেশে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা থাকা না থাকা মূখ্য বিষয় নয়, যেমন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে বিশেষ করে সৌদি আরবের সাথে তাদের সম্পর্ক এক্ষেত্রে উল্লেখ করার মতো। সেখানে ইসরায়েলের অস্তিত্ব যুক্তরাষ্ট্রের জন্য জরুরি বিধায় গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের ধারণা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে চর্চার ভেতর আসে না। দ্বিতীয়ত, সম্পর্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের দিকটিকে অন্যতম শর্ত হিসেবে বিবেচনা করা। এক্ষেত্রে পশ্চিমা উন্নত দেশ এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে ভারত এবং বাংলাদেশ অন্যতম।


মূলত, এ সকল দেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্র এক ধরণের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ হতে চায়, যা তাদের অভ্যন্তরীণ মূল্যবোধের চর্চার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আমরা যদি একটু লক্ষ্য করি তাহলে দেখতে পাই যে চীনের সাথে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বৈরি সম্পর্কের আলোকে ভারতের মত গণত্যান্ত্রিক দেশের সাথে তারা বর্তমান এক ধরণের দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ। এক্ষেত্রে ভারতের নিকটতম এবং পরীক্ষিত বন্ধু হিসেবে বাংলাদেশের গুরুত্ব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অপরিসীম। এই জায়গায় আমরা বরাবরই যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক চর্চার ক্ষেত্রে যে ধরণের ভূমিকা দেখেছি তা যদি নেতিবাচক হিসেবে না দেখে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার চেষ্টা করি তাহলে বলা যায় যে, বরাবরই বাংলাদেশের মানবাধিকারের চর্চা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রসার, শ্রম অধিকার ইত্যকার বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন: ‘আল্লাহ তাদের মাফ করবেন না’


সাম্প্রতিক সময়ে, বিশেষ করে গত বছরের ডিসেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী র‍্যাবের কিছু সদস্যের প্রতি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা নিয়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মধ্যে কিছুটা শীতলতা বিরাজ করছে। এখানে যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে সরকারের প্রতি মানবাধিকারের বিষয়টি নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ করে এক ধরণের বার্তা প্রদান করা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের তরফ থেকেও এ ধরণের ঘটনার পালটা প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। তথাপি বিষয়টি দুদেশের পারষ্পারিক সম্পর্কের মধ্যে খুব একটা প্রভাব পড়বে বলে অনেকে ধারণা করলেও আমি ব্যক্তিগতভাবে এটা মনে করছি না। তবে এক্ষেত্রে সরকারের সক্রিয়তার অভাবকে কিছুটা দায়ী করতে চাই। যুক্তরাষ্ট্র যখন কোনো দেশের উপর এ ধরণের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে চায়, তা কখনও হুট করে হয় না, বিষয়গুলো এক ধরণের দীর্ঘস্থায়ী প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সাধিত হয়ে থাকে।

সুতরাং সরকারের দিক থেকে বিরোধী দলগুলোর প্রতি বিশেষ করে বিএনপি যুক্তরাষ্ট্রে লবিস্ট নিয়োগ করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রভাবিত করেছে বলে যে অভিযোগ করা হয়েছে এটা যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে এর বিরুদ্ধে আগে থেকেই সতর্ক হওয়া উচিৎ ছিল। বর্তমান বাস্তবতায় আমরা নিজেরাও জানি, যে অভিযোগে র‍্যাবকে অভিযুক্ত করা হয়েছে সেই অভিযোগ আসলে অনেক পুরাতন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে এধরণের পদক্ষেপের ফলে আমাদের নিজেদের অবশ্যই সংশোধনের মধ্য দিয়ে যেতে হবে, অন্যথায় এটা আমাদের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।


ওয়াশিংটনে সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তিকে সামনে রেখে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী সামনের দিকে এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিতে একমত হয়েছেন। সেই সাথে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেও স্বীকার করে নিয়েছেন যে, র‍্যাবের দিক থেকেও কিছুটা ভুল রয়েছে এবং সরকার এগুলোকে সংশোধনের চেষ্টা করে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে প্রকারান্তরে আরও জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী ভিত্তির উপর দেখতে ভবিষ্যতের নির্বাচনগুলোর দিকে তারা দৃষ্টি রাখবে। বিষয়টি সরকারের জন্য একটি বিশেষ বার্তা।

নির্বাচনী কাঠামোকে একটি শক্ত প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির উপর দাঁড় করানোটা এই মুহূর্তে আমাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। উন্নয়নের প্রতিটি সূচকে বাংলাদেশ ভালো করছে, এটি যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো স্বীকার করছে, তবে যে বিষয়গুলোতে আমাদের অবনতি ঘটছে, আমাদের এই সময়ের উন্নয়ন কোনোভাবেই সেগুলো বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। আমাদের এটাও মনে রাখতে হবে যে যুক্তরাষ্ট্র কিন্তু বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কিছু বিষয়ে কিছু বার্তা দিয়েছে কেবল।

আরও পড়ুন: যেভাবে চারজন ক্ষমতাধর ভাই একটি দ্বীপজাতিকে ভেঙে দিল

কোনোভাবেই তারা বাংলাদেশের দিক থেকে হাত গুটিয়ে নেয়নি। আর যদি সে রকম হত তাহলে অব্যাহতভাবে আমাদের উন্নয়ন কার্যক্রমে তারা সহায়তা প্রদর্শন করত না। কোভিড-১৯ মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকারের প্রচেষ্টার সাথে তারা সহযোগী হয়েছে এবং সর্ববৃহৎ অনুদান হিসেবে বাংলাদেশকে তারা বিভিন্ন দফায় ৬ কোটিরও অধিক ভ্যাকসিন সরবরাহ করেছে। বাংলাদেশের উন্নয়নের দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে বিভিন্ন অনুদান হিসেবে ৮ বিলিয়ন ডলারের অধিক সহয়তা করেছে। আগামী দিনগুলোতে এই সম্পর্কের ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক আরও অধিকতর উন্নয়নের সম্ভাবনা রয়েছে, বিশেষ করে সরকার গৃহীত ভিশন-২০৪১ যদি আমরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্জন করতে সক্ষম হই তাহলে এক উন্নত বাংলাদেশের সাথে উন্নত এক আমেরিকার সম্পর্ক সত্যিই অন্যরকম এক আবহের সৃষ্টি করবে।


লেখক: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। 

]]>
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url