ডেঙ্গু: এতো প্রাণহানির পর এলো বিটিআই!


August 06, 2023 at 10:02AM
from somoynews.tv | RSS Feed

দুই ঘণ্টার মধ্যে এডিস মশা ও কিউলেক্স মশার লার্ভা ধ্বংস করতে সক্ষম বিটিআই (বাসিলাস থুরিনজেনসিস ইসরায়েলেনসিস)। যা আনা হয়েছে সিঙ্গাপুর থেকে। অথচ এরই মধ্যে চলতি বছর সারা দেশে ডেঙ্গুতে মারা গেছে ৩০৩ জন। তাহলে এতো প্রাণহানির পর কেন, এতোদিন কেন আনা হলো না- এই প্রশ্ন থেকেই যায়।

এ বিষয়ে কীটতত্ত্ববিদ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার সময় সংবাদকে বলেন, ‘একটি কিটনাশক বাংলাদেশে ব্যবহার করার জন্য রেজিস্ট্রেশন ও আমদানি প্রক্রিয়ার একটি ব্যাপার রয়েছে। কীটনাশকটি আনার কাজ অনেক আগেই শুরু হয়েছে। মূলত এই দীর্ঘ প্রক্রিয়াতেই দেরি হয়েছে।’

পূর্বপ্রস্তুতির কোনো ঘাটতি রয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় পূর্বপ্রস্তুতি ছিল বলেই এটি এখন এসেছে। নয়তো এতো তাড়াতাড়ি আনা সম্ভব হতো না। তাই আমার মনে হয় যখনই আসুক এটি প্রশংসার দাবি রাখে। যদি সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায় তাহলে আমরা এর সুফল পাবো।’

তবে অনেকের মতে, যেহেতু বিগত কয়েক বছরে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেশি ছিল, সেহেতু আগেই ব্যবস্থা নেয়া উচিত ছিল। তাহলে হয়তো ডেঙ্গুতে এতো প্রাণহানি ঘটতো না। এখন দেখার পালা বিটিআই প্রয়োগে কতটা প্রাণহানি কমানো সম্ভব হয়। একদিক দিয়ে আশার কথা, অন্য কোনো সিটি করপোরেশন কিন্তু এ ধরণের পদক্ষেপ নেয়নি। ঢাকা উত্তর সিটি নিয়েছে। তাদের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাতেই হয়।

বিটিআই একধরনের ব্যাকটেরিয়া। এটি মশার লার্ভা ধ্বংস করে। ২৫ গ্রামের এক প্যাকেট বিটিআই ১০ লিটার পানিতে ২৫ থেকে ৫০ বর্গমিটার এলাকায় ছিটাতে হয়। প্রাথমিকভাবে ঢাকার সড়কের পাশের নালায় এই ওষুধ ছিটানো হবে বলে জানায় ডিএনসিসি। কীটনাশকটির বৈশিষ্ট্য হলো, এতে মানুষের শরীরে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয় না। আর বিটিআই পানিতে প্রয়োগ করলেও অন্য জলজ প্রাণীর কোনো ক্ষতি হবে না।

আরও পড়ুন: কেন ভয়ংকর রূপ নিলো ডেঙ্গু?

বিটিআই মশা নিধনে কতটা কার্যকর জানতে চাইলে কবিরুল বাশার বলেন, ‘কোনো স্থানে যখন বিটিআই প্রয়োগ করা হয়, তখন মশার লার্ভা সেটিকে খাবার হিসেবে গ্রহণ করে। এটি থেকে নির্গত টক্সিনের বিষক্রিয়ায় মশার মিড-গাটের এপিথেলিয়াল কোষগুলো ফুলে ফেটে যায়। যার কারণে লার্ভার অন্ত্রের প্রাচীর মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে মারা যায়।’

তিনি বলেন, ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে আমরা মশা মারতে এর কার্যকারিতা পরীক্ষা করেছি। এতে খুব ভালো ফল পাওয়া গেছে। বিভিন্ন দেশে গবেষকরা ল্যাবরেটরি ও মাঠ পর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এটিকে মশার লার্ভা দমনে কার্যকর উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।’

এ কীটনাশকে মানুষের কোনো ক্ষতি হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি মানুষ বা পরিবেশের কোনো ক্ষতি করবে না। মানুষের পেটে গেলে কিংবা গোসলের পানিতেও বিটিআই দিলে কোনো ক্ষতি নেই। কারণ, এটি বায়ো লার্ভিসাইড। আবার মশা ছাড়া অন্য কোনো প্রাণীরও কিছু হবে না।

কবিরুল বাশার বলেন, ‘বিটিআই দুই ঘণ্টার মধ্যে মশার লার্ভা মারতে সক্ষম। এক বর্গমিটার জায়গায় দশমিক ৫ গ্রাম ওষুধ প্রয়োগ করতে হবে। এটি যখন ছিটানো হবে, মশা খাবার মনে করে খাবে। পরে দুই ঘণ্টার মধ্যে মশার খাদ্যনালি পচে নষ্ট হবে। যদি সঠিকভাবে, সঠিক মাত্রায়, সঠিক সময়ে, সঠিক জায়গায়, নির্ধারিত সময় পরপর প্রয়োগ করা যায়, তাহলে ডেঙ্গু মুক্ত হওয়া সম্ভব।’

এডিসসহ সব ধরনের মশার লার্ভা ধ্বংসে রোববার (৬ আগস্ট) থেকে আধুনিক প্রযুক্তির কীটনাশক বিটিআই প্রয়োগ শুরু করবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। বৃহস্পতিবার (৩ আগস্ট) দুপুরে গুলশানে ডিএনসিসির নগর ভবনে আয়োজিত এক সভায় মেয়র আতিকুল ইসলাম এ ঘোষণা দেন।

তবে বিটিআই প্রয়োগের আগে ডিএনসিসির স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে সিঙ্গাপুরের একটি বিশেষজ্ঞ দল শুক্র ও শনিবার বৈঠক করবে বলেও জানান তিনি।

মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘ডেঙ্গু বিষয়ে নগরবাসীকে সচেতন ও সতর্ক করতে আমরা কলসেন্টারের মাধ্যমে কল করছি। উদ্দেশ্য, উত্তর সিটির বাসিন্দাদের ফোন করা। কিন্তু সবার নম্বর পাচ্ছি না।’

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর উদ্দেশে মেয়র বলেন, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনায় সিটি করপোরেশনে আরও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দিতে হবে। যাতে সারা বছর ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা যায়। এছাড়া সিটি করপোরেশনে আরও বেশি কীটতত্ত্ববিদ প্রয়োজন। যাতে তাদের মাধ্যমে মশার তথ্য সংগ্রহ করে কাজে লাগানো যায়।

আরও পড়ুন: ভয়াবহ ডেঙ্গু পরিস্থিতি, বাড়ছে ঢাকামুখী রোগীর চাপ

সভায় উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমরা ডেঙ্গু রোগ নিয়ে কঠিন একটা সময় পার করছি। এডিস মশা নিধন ও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আমাদের আরও গুরুত্ব দিতে হবে। এটিকে হালকা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই।’

মন্ত্রী বলেন, বিশ্বের ১২৯টি দেশে এডিস মশা রয়েছে। সিঙ্গাপুর অনেক উন্নত দেশ হওয়ার পরও গত বছর সেখানে ৩২ হাজার মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। মৃত্যু হয়েছে ১৯ জনের। সিঙ্গাপুরের মোট ৫৫ লাখ মানুষের বিপরীতে যদি ৩২ হাজার আক্রান্ত হয়, তাহলে ঢাকাতে ২ কোটি মানুষের হিসেবে ১ লাখ ২০ হাজার আক্রান্ত হওয়ার কথা। তবে ডেঙ্গুকে হালকাভাবে নিলে ক্ষতি আরও হবে।

এই বিপদের সময়ে জনপ্রতিনিধিদের (ওয়ার্ড কাউন্সিলর) এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, কাউন্সিলররা সেবা করার জন্য নির্বাচিত হয়েছেন। তাদের কাজের কোনো নির্দিষ্ট ক্ষেত্র নেই। যখন যেখানে যেভাবে প্রয়োজন, তখন সেখানে কাজ করতে হবে। ডেঙ্গুতে এখন পর্যন্ত যতজন মারা গেছেন, সেটা জনপ্রতিনিধিদের শান্তি দেয়ার কথা নয়।

এই পরিস্থিতিতে মানুষকে সাহস দিতে করোনাকালের মতো মাঠে থাকতে হবে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এখন মাঠে কাজ করলে নির্বাচনের সময় আর আলাদাভাবে ভোট চাইতে হবে না।

এদিকে শনিবার (৫ আগস্ট) স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানা যায়, ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত ৩০৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।

আক্রান্তদের মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৮৯২ জন। আর ঢাকার বাইরের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৮৬৫ জন। দিন দিন ডেঙ্গু ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে।

আরও পড়ুন: ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ, কিছুই করতে পারছে না ঢাকার দুই সিটি!

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার (৫ আগস্ট) সকাল ৮টা পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ২৪৯৫ জন রোগী দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১০৬৯ জন আর ঢাকার বাইরের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৪২৬ জন।

বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে মোট ৯৩৩৪ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন আছেন। ঢাকার সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে বর্তমানে ৪৬৮০ জন। অন্যান্য বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ৪৬৫৪ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন।

চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সারা দেশে এখন পর্যন্ত ৬৩ হাজার ৯৬৮ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকায় ৩৪ হাজার ৫২৩ জন এবং ঢাকার বাইরে চিকিৎসা নিয়েছেন ২৯ হাজার ৪৪৫ জন।

আক্রান্তদের মধ্যে হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৫৪ হাজার ৩৩১ জন। ঢাকায় ২৯ হাজার ৬০২ এবং ঢাকার বাইরে ২৪ হাজার ৭২৯ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।

মৃত্যুর জন্য বিগত বছরের তুলনায় এবার ডেঙ্গুর হেমোরেজিক ফিবার ও শক সিনড্রোমকে দায়ী করে রোগী ও স্বজনদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ।

 

]]>
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url