কেমন আছেন মুসলিমরা?

August 19, 2023 at 04:58AM
from somoynews.tv | RSS Feed
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরে গত তিন মাসের বেশি সময় ধরে মেইতেই ও কুকি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ চলছে। এছাড়া, দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্য হরিয়ানায়ও গত ৩১ জুলাই হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা হয়েছে। দুটি আলাদা রাজ্যে সংঘর্ষের সূত্রপাত ভিন্ন হলেও, সেখানকার মুসলিম সম্প্রদায়গুলো প্রশাসনিকসহ নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এমনকি অর্থনৈতিকভাবে মুসলিমদের বয়কটের ডাকও দিয়েছে স্থানীয় কিছু হিন্দু সংগঠন।
মণিপুর রাজ্যে জাতিগত সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার ১০০ দিন পেরিয়ে গেছে। রাজ্যের পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসছে এবং গত কয়েকদিন ধরে নতুন করে বড় ধরনের কোনো সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি। তবে সংঘর্ষের কেন্দ্রস্থল কুকি সংখ্যাগরিষ্ঠ চুরাচাঁদপুর জেলার মধ্যবর্তী এলাকা এবং মেইতেই সংখ্যাগরিষ্ঠ বিষ্ণুপুর জেলায় ক্রমাগত গোলাগুলি ও বোমা হামলার ঘটনা স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।
মণিপুরের প্রায় ৩২ লাখ জনসংখ্যার অন্তত ৯ শতাংশ মুসলিম। কুকি এবং মেইতেইদের মধ্যে লড়াইয়ের কারণে মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজন দুই পক্ষকেই শান্তির আহ্বান জানিয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিনিধিরা বিষ্ণুপুর জেলার কোয়াকতা গ্রামে গিয়ে দেখেছেন, সেখানকার রাস্তাঘাটে ব্যারিকেড দিয়ে রেখেছে পুলিশ।
আরও পড়ুন: হরিয়ানায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মূলহোতা বিট্টু গ্রেফতার
গত ৬ আগস্ট বিষ্ণুপুর জেলায় গ্রামের বাড়িতে ঘুমন্ত অবস্থায় এক বাবা ও তার ছেলেসহ তিনজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। মেইতেইদের অভিযোগ, চুরাচাঁদপুরের দুষ্কৃতিকারীরা রাতে গ্রামে অনুপ্রবেশ করে এবং পরিবারটির ওপর হামলা চালায়।
বিষ্ণুপুর জেলার জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের নেতা সালাউদ্দিন কাসেমি এনডিটিভিকে বলেছেন, ‘পরিস্থিতির কারণে কোয়াক্তার দুটি মসজিদ কয়েক ঘণ্টার জন্য নিরাপত্তা বাহিনী ব্যবহার করেছে এবং সেখান থেকে গুলি চালানো হয়। কিন্তু আমরা তাদের কাছে আমাদের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেছি, পরে তারা মসজিদ থেকে চলে গেছে।’
মণিপুরের কোয়াক্তা একটি বহুজাতি গোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকা। যেখানে একসময় মেইতেই এবং কুকিরা প্রতিবেশী হিসেবে বসবাস করত। শহরটির মোট জনসংখ্যার ৯০ শতাংশই মুসলমান। সংঘাতে না জড়ালেও মণিপুরের মুসলমানরা মেইতেই এবং কুকিদের সংঘাতের মধ্যে অসহায়ভাবে আটকা পড়েছে। কুয়াক্তায় তাদের জীবন-জীবিকা ভেঙে পড়েছে।
কোয়াক্তার মুসলিম নেতা নাসির খান বলেন,
‘স্থানীয় মানুষ আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। ভোজ্য ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধি এবং জীবিকার অভাবে তাদের জীবন চরমে পৌঁছেছে। বোমা হামলার কারণে স্কুলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেখানকার শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করতে পারছে না।’
স্থানীয় আরেক মুসলিম নেতা হাজী রাফাত আলী বলেছেন, ‘আমরা মেইতেই পাঙ্গালরা (মেইতেই মুসলিমদের পাঙ্গাল বলা হয়) এখানকার একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। নেপালি এবং অন্যান্যদের মতো আমরাও এখানে খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছি। আমাদের জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এলাকায় শান্তি ফিরিয়ে আনতে আমরা আমাদের মেইতেই এবং কুকি ভাই-বোনদের কাছে অনুরোধ জানিয়েছি।’
মণিপুরের মুসলিম নেতারা তাদের এলাকায় আরও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে অনুরোধ জানাতে দিল্লি সফর করেছেন।
কুকি সংখ্যাগরিষ্ঠ চুরাচাঁদপুর জেলা ও মেইতেই অধ্যুষিত বিষ্ণুপুর জেলার সীমান্তে কোয়াক্তা শহরটির অবস্থান। গত তিন মাসের বেশি সময় ধরে সংঘর্ষের মাঝে পড়েছে এই শহরটি। এতে কমপক্ষে ১২ জন আহত হয়েছেন।
এদিকে ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক সহিংসতার জেরে ওই অঞ্চলের মুসলিমদের সঙ্গে অর্থনৈতিক লেনদেন স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে উগ্র ডানপন্থি হিন্দু সংগঠনগুলো। তারা মুসলমানদের সংঘাতকবলিত গ্রাম থেকে বের করে দেয়ারও আহ্বান জানিয়েছে।

গত ৩১ জুলাই হরিয়ানা রাজ্যের নুহ জেলায় বিশ্ব হিন্দু পরিষদের একটি ধর্মীয় শোভাযাত্রায় হামলার পর সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ শুরু হয়। এতে দুই নিরাপত্তারক্ষীসহ ছয়জন নিহত হন।
পরে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ দ্রুত অন্যান্য জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। গুরুগ্রামে একটি মসজিদে আগুন দেয়া হলে সহকারী ইমাম ২২ বছরের মোহাম্মদ সাদ নিহত হন।
সহিংসতার পর বিভিন্ন হিন্দু সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রতিবাদের আহ্বান জানানো হয়। হিসার জেলার হানসি শহরে সম্প্রতি এক বিক্ষোভ অনুষ্ঠানে হিন্দু ডানপন্থি দল বজরং দলের এক বক্তাকে কৃষ্ণ গুর্জার স্থানীয় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের জন্য কাজ করা যেকোনো মুসলিম কর্মচারীকে বরখাস্ত করার জন্য আল্টিমেটাম দিতে শোনা যায়।
তিনি বলেন,
‘দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে মুসলিম কর্মচারীদের বরখাস্ত করতে হবে, তা না হলে তাদের বয়কট করা হবে। এখানে শুধুমাত্র হিন্দু হকাররা উপস্থিত থাকবে। যদি কোনো মুসলিম ফেরিওয়ালা পাওয়া যায়, তবে তার ভাগ্যে যা ঘটবে; সে জন্য আপনারা দায়ী থাকবেন।’
গুর্জার পরে সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে বলেন, ‘আমি রোহিঙ্গাদের মতো বহিরাগত মুসলিমদের উচ্ছেদের কথা বলেছিলাম।’
হানসির মুসলিমরা শহর ছেড়ে চলে যেতে চান কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বজরং দলের উদ্দেশ্য কাউকে ভয় দেখানো নয়। কিন্তু বজরং দল নিজে ভয় পাবে না এবং হিন্দু সম্প্রদায়কে ভয় পেতে দেবে না।’
আরও পড়ুন: জাতিগত সহিংসতায় উত্তপ্ত ভারত, হরিয়ানায় নিহত ৪
এদিকে হরিয়ানার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অনিল ভিজ বলেছেন, হরিয়ানায় সহিংসতার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৩১২ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। নজরদারিতে রাখা হয়েছে অন্তত ১০৬ জনকে।
বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়া হয় ঘরবাড়ি
হরিয়ানার নুহ জেলায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতা শুরু হওয়ার পর আগস্টের শুরুর দিকে রাজ্য সরকার মুসলিমদের মালিকানাধীন অনেক বাড়ি, দোকান ও অফিস কমপ্লেক্স বুলডোজার দিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছে। জানা গেছে, অন্তত ৩৫০টি বস্তি এবং ৫০টি পাকা ঘর ভেঙে দেয়া হয়েছে। এ ঘটনার পর পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এই ধ্বংসাত্মক অভিযানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।
রাজ্যের ডেপুটি কমিশনার ধীরেন্দ্র খাড়গাতা জানিয়েছেন, ‘আদালতের নির্দেশের পরই বাড়ি ভাঙা বন্ধ রাখা হয়েছে।’
বিরোধী রাজনীতিকদের দাবি,
প্রশাসন শুধুমাত্র মুসলিমদের বাড়িই ভেঙেছে। যাদের বাড়ি ভাঙা হয়েছে তারা দাবি করেছেন, কোনোরকম নোটিশ না দিয়েই এমন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
যদিও প্রশাসন বলছে, ‘যেগুলো বেআইনি নির্মাণ, সেগুলোই ভাঙা হয়েছে। কোনো ব্যক্তিকে টার্গেট করা হয়নি। আমাদের একটাই লক্ষ্য, শান্তি প্রতিষ্ঠা করা।’
এর আগে, বিজেপিশাসিত উত্তরপ্রদেশ ও মধ্যপ্রদেশে সহিংসতার পরও একইভাবে বাড়ি ভাঙা হয়েছিল। এমন ঘটনা ঘটেছে দিল্লিতেও। পরে সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশে তা বন্ধ হয়। এবার হরিয়ানাতে সেই একই ঘটনা ঘটলো।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা, এনডিটিভি, ডয়চে ভেলে