রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ: কীভাবে দেখছে সৌদি আরব

November 06, 2022 at 06:56AM
from somoynews.tv | RSS Feed
চলতি বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে বিশেষ সামরিক অভিযানের ঘোষণা দিয়েছিলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এই অভিযানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অনেক দেশ ইউক্রেনের পাশে দাঁড়িয়েছে। আবার অনেকে ইউক্রেন বা রাশিয়া কোনো পক্ষকেই সমর্থন জানায়নি। তাদের মধ্যে সৌদি আরব অন্যতম; দেশটি সরাসরি যুদ্ধকে সমর্থন করেনি, আবার যুদ্ধের বিরুদ্ধেও তেমন কথা বলেনি।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই জাতিসংঘে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব ‘নিয়ম-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক আদেশ’ রক্ষার বিষয় হিসাবে ইউক্রেনের পক্ষে অনেকগুলো রাষ্ট্র সমর্থন করে যাচ্ছে। তবে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থা (জিসিসি) দেশগুলো যুদ্ধে কোনো পক্ষকেই সরাসরি সমর্থন জানায়নি।
সৌদি আরব এবং জিসিসিভুক্ত অন্যান্য দেশগুলো মূলত ইউক্রেনের যুদ্ধকে ইউরোপীয়দের সংঘাত হিসেবে দেখে, যার জন্য আরব রাষ্ট্রগুলো মনে করে ভ্লাদিমির পুতিনের সরকারের বিরুদ্ধে তাদের দাঁড়ানো কোনো দরকার নেই। যদিও সিরিয়া ব্যতীত জিসিসি-ভুক্ত কোনো দেশ রাশিয়ার আগ্রাসনের সরাসরি সমর্থন জানায়নি। এ ছাড়া ইউক্রেনের চারটি অঞ্চলেকে রাশিয়ার ভূখণ্ডে সংযুক্তিকরণকে সমর্থন জানায়নি। আরব রাষ্ট্রপ্রধানরা মনে করেন এই সংঘাতের কারণে মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করার প্রয়োজন নেই তাদের।
এইকভাবে, জিসিসি রাষ্ট্রগুলো ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের নিন্দা করে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবগুলোতে সমর্থন জানিয়েছে। তবে মস্কোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা বা রাশিয়াকে চাপিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে অন্যান্য নীতি বাস্তবায়নে পশ্চিমা শক্তিগুলোর সঙ্গে যোগ দেয়নি।
ওয়াশিংটন ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আরব গালফ স্টেট ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ হুসেইন ইবিশ গত মাসে বলেছেন, ইউক্রেন যুদ্ধকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি নির্দিষ্ট রূপান্তরমূলক মুহূর্ত হিসাবে পশ্চিমাদের মতো মধ্যপ্রাচ্যসহ এশিয়া ও আফ্রিকার বেশিরভাগ উন্নয়নশীল দেশ সেভাবে দেখছে না।
আরও পড়ুন: আদৌ কি থামবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ?
ইউক্রেনের যুদ্ধ যখন নবম মাসে প্রবেশ করেছে, তখন কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, সম্ভবত মস্কোর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য পশ্চিমাদের এখনও গায়ে মাখবে না সৌদি আরব। এ যুদ্ধে নিরপেক্ষতার কথা বলে সৌদি স্বার্থের জন্য কাজ করতে চাইছেন দেশটির নেতারা। এ ছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এমন একটি বার্তা পাঠাতে চাইছেন যে, সৌদি আরব ওয়াশিংটনের ইশারায় চলে না।
ইয়েমেনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফিয়েরস্টেইন আল জাজিরাকে বলেছেন, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পরাশক্তিগুলো প্রতিযোগিতার বিষয়গুলিতে জড়ানো এড়াতে চায়।’ তারা তাদের স্বার্থ স্পষ্ট করেছেন। সৌদি নেতারা নিরাপত্তার ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক, এক নম্বর অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে চীন এবং ওপেক প্লাসের অংশীদার রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে নজর দিচ্ছে।
সৌদি আরব-রাশিয়া সম্পর্ক
যদিও ওপেক প্লাসের ঘোষণাটি ওয়াশিংটনের কর্মকর্তাদের ক্ষুব্ধ করেছে। তারা মনে করেন ওপেক প্লাসের সিদ্ধান্ত রাশিয়াকে মার্কিন ও ইউরোপীয় নিষেধাজ্ঞা সহ্য করতে এবং পুতিনের সরকারকে বিচ্ছিন্ন করার পশ্চিমা প্রচেষ্টাকে দুর্বল করতে সাহায্য করবে।
রিয়াদের কিং ফয়সাল সেন্টারের সিনিয়র ফেলো জোসেফ এ কেচিচিয়ান আল জাজিরাকে বলেছেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই যে রিয়াদ মস্কোর সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছে।
২০২২ সালে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি প্রায় ১০০ ডলারের আশেপাশে রাখতে চেয়েছিলেন সৌদি কর্মকর্তারা। মূলত দেশটিতে বিভিন্ন উন্নয়ন বিনিয়োগের জন্য অর্থায়ন প্রয়োজন যা শুধুমাত্র ওপেক প্লাস দেশগুলো চুক্তির মাধ্যমে অর্জন করা যেতে পারে। এ ছাড়া বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য যোগাযোগের মাধ্যমগুলো খোলা রাখা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন: ইউক্রেনে রাশিয়া কী চায়, জানাল গোয়েন্দা প্রধান
ইউক্রেনে সহায়তা
ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া দুই মেরুতে থাকায় উভয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখা সৌদি আরবের জন্য চ্যালেঞ্জিং বিষয়। তবে ২৪ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়ার সঙ্গে ভালো সর্ম্পক থাকা সত্ত্বেও ইউক্রেনের জন্য সহায়তা করে যাচ্ছে সৌদি আরব।
সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব এবং তুরস্কের মধ্যস্থতায় কিয়েভ এবং মস্কোর মধ্যে বন্দী বিনিময় নিয়ে চুক্তি হয়। এর ফলে রাশিয়া থেকে কিছু পশ্চিমা নাগরিক (দুই মার্কিন নাগরিকসহ) ইউক্রেনের পক্ষে যুদ্ধ করার সময় যুদ্ধক্ষেত্রে বন্দী হওয়ার পর মুক্তি পায়।
এই পদক্ষেপ পশ্চিমা স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর না হয়ে বরং লাভজনক হিসেবে মার্কিন ও ইউরোপের কাছে সংঘাতে তার অবস্থান উপস্থাপন করতে সাহায্য করেছে।
এ ছাড়া গত মাসের শুরুর দিকে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস) ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে ফোনালাপ করেছেন। এমবিএস যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশটিকে ৪০ কোটি ডলার সহায়তা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। এ পদক্ষেপকে অনেক বিশ্লেষক পশ্চিমে সংঘাতে নিরপেক্ষ থাকার একটি শক্তিশালী ধারণা তৈরি করার জন্য সৌদি প্রচেষ্টা হিসাবে দেখেছেন।
ওয়াশিংটর ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা আরব সেন্টারের গবেষণা ও বিশ্লেষণ বিভাগের পরিচালক ইমাদ হারব আল জাজিরাকে বলেছেন, ‘ওপেক প্লাস সিদ্ধান্তে মার্কিন ক্ষোভ অনুভূত হওয়ার পরে সৌদির মানবিক সহায়তাকে একটি ইঙ্গিতের চেয়ে বেশি হিসাবে দেখা কঠিন। রিয়াদ বলে আসছে যে তারা সর্বদা সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানকে সমর্থন করে, তবে ইউক্রেনের আগ্রাসনের সম্পূর্ণ নিন্দা করা থেকে বিরত ছিল। এখন সাহায্যের ঘোষণাটি অবশ্যই ইউক্রেন জন্য প্রশংসিত হয়েছে, তবে এটি তেলের উৎপাদন কমানোর সিদ্ধান্তের কারণে আলাদা করা কঠিন।’