কতটা ভয়ংকর ছিলেন ‘আসল রোনালদো’


November 20, 2022 at 04:55AM
from somoynews.tv | RSS Feed

ফুটবল ইতিহাসের সেরা নম্বর নাইনের তকমাটা অনেকটা বিতর্কহীনভাবে তার দখলে। গোলরক্ষকদের জন্য ছিলেন সাক্ষাৎ দুঃস্বপ্ন। ইনজুরি বাধ না সাধলে সর্বকালের সেরার বিতর্কও নাকি শেষ করে দিতে পারতেন তিনি। বলা হচ্ছে ব্রাজিলের কিংবদন্তি রোনালদোর কথা।

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর উত্থানে কিছুটা আড়ালে পড়ে গেলেও ‘আসল রোনালদো’ নামে এখনো বিশ্বে তুমুল আলোচিত রোনালদোর নাম। ব্রাজিলের হয়ে তিনটি বিশ্বকাপে প্রতিনিধিত্ব করা রোনালদো লুইস নাজারিও দি লিমার যা কীর্তি, তাতে তাকে ভুলে যাওয়াটা সম্ভবও না আসলে। বিশ্বকাপের মঞ্চে তার মতো ঔজ্জ্বল্য ছড়াতে পেরেছেনই বা ক’জন! তাইতো তার পরবর্তী প্রজন্মের অধিকাংশ স্ট্রাইকার আইডল হিসেবে তাকেই মানেন। এমনকি নাক উঁচু জলাতান ইব্রাহিমোভিচ পর্যন্ত মেনে নেন তার শ্রেষ্ঠত্ব।

রোনালদো আসলে কতটা ভয়ংকর ছিলেন তা বোঝা যায় তৎকালীন সময়ের সেরা ডিফেন্ডার-গোলরক্ষক ও কোচদের কথাতেই।

ইতালির কিংবদন্তি ডিফেন্ডার পাওলো মালদিনি তার সেরা তিন ফুটবলারের তালিকায় রেখেছেন এই ব্রাজিলিয়ানকে। ক্যারিয়ারে বেশ কয়েকবার রোনালদোকে আটকানোর ভার পাওয়া মালদিনি বলেন, ‘রোনালদোকে আটকানো অসম্ভব।’ ২০০২ বিশ্বকাপের ফাইনালে রোনালদোর কাছে হার মানা জার্মান গোলরক্ষক অলিভার কান রোনলদোর জার্সির সঙ্গে ছবি তুলে ক্যাপশন দিয়েছিলেন ‘আমার দুঃস্বপ্ন।’

জলাতান ইব্রাহিমভিচ তো ফুটবলের ‘গ্রেটেস্ট এভার’ হিসেবেই মানেন রোনালদোকে। অহংকারী বলে দুর্নাম থাকা ইব্রা সহজে কাউকে প্রশংসা করার লোক নন, কিন্তু এই এক জায়গায় তার মুগ্ধতা প্রকাশে কখনোই পিছপা হননি তিনি।

ব্রাজিলের কংবদন্তির সম্পর্কে তার মূল্যায়ন, ‘আমার জন্য , রোনালদোই ফুটবল, যেভাবে তিনি নাচাতেন। কোনো সন্দেহ ছাড়াই তিনি ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড়।’

স্প্যানিশ কোচ ভিসেন্তে দেল বস্ক বলেন, ‘রোনালদোর বিপক্ষে খেলার সময় তার বিরুদ্ধে পরিকল্পনা না করে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করাই উত্তম। কারণ, রোনালদো চাইলে দুনিয়ার যেকোনো পরিকল্পনা বা মার্কিং ভাঙতে পারে।’

আরও পড়ুন: যেভাবে জীবনের মোড় ঘুরে যায় চায়ের দোকানে কাজ করা পেলের

ইব্রার মতো স্পেশাল ওয়ান মরিনিয়োর চোখেও রোনালদোর জায়গাটা অনেক উঁচুতে। এই পর্তুগিজ কোচ বলেন, ‘প্রতিভা আর ফুটবলের দক্ষতার কথা আসলে সর্বকালের সেরা হলেন রোনালদো, মেসি-রোনালদো (পর্তুগাল) কেন, পৃথিবীর আর কেউ এই দিক দিয়ে রোনালদোর পাশে আসতে পারবে না।’

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো বা লিওনেল মেসির মতো ক্লাব ক্যারিয়ারে এতো অর্জন না থাকার পরও একজনকে নিয়ে এতো এতো প্রশংসার কারণ আসলে কী, একটু তলিয়ে দেখা যাক তবে।

ব্রাজিলের রিও ডি জেনেইরোতে জন্ম নেয়া রোনালদোর জন্মই হয়েছিল ফুটবল খেলার জন্য। মাত্র ১১ বছর বয়সে ফুটবলের জন্য স্কুল ছেড়ে দেন তিনি। যোগ দেন স্থানীয় ফুটসাল দলে। প্রথম মৌসুমেই ১২ বছর বয়সী রোনালদো করে বসেন রেকর্ড ১৬৬ গোল। এক ম্যাচে তো দলের ১২ গোলের ১১টিই করেন তিনি।

ব্রাজিলের ক্লাব ক্রুজেইরোর হয়ে পেশাদার ক্যারিয়ার শুরুর সময় রোনালদোর বয়সটা সতেরোও হয়নি। ক্রুজেইরোর হয়ে সে বয়সেই এক ম্যাচে বাহিয়ার বিপক্ষে ৫ গোল করে আলোড়ন তোলেন তিনি। ক্লাবটির হয়ে প্রথম মৌসুমে ৪৭ ম্যাচে করেন ৪৪ গোল। সে সময়ের প্রেক্ষাপটে তো বটেই এই যুগেও ১৬ বছরের কিশোরের জন্য এমন পারফরম্যান্স অবিশ্বাস্য।

ক্রুজেইরোর হয়ে এমন পারফরম্যান্সে খুলে যায় ইউরোপের দ্বার। ১৯৯৪ বিশ্বকাপের পর যোগ দেন ডাচ লিগের দল পিএসভি আইন্দহোভেনে। নতুন ক্লাবের হয়ে অভিষেকের মাত্র ১০ মিনিটের মাথায় প্রথম গোলটি করেন তিনি। সে মৌসুমে লিগে ৩০ গোল করেন তিনি, যার মধ্যে ৭টি ব্রেস ও একটি হ্যাটট্রিকও ছিল। সেবার উয়েফা কাপে বেয়ার লেভারকুসেনের বিপক্ষে হ্যাটট্রিকের পর ক্লাবটির কিংবদন্তি ও বিশ্বকাপজয়ী জার্মান স্ট্রাইকার রুডি ভোলার বলেন, ‘আমার জীবনে আমি কখনো একজন ১৮ বছর বয়সীকে এভাবে খেলতে দেখিনি।’

১৯৯৬ সালে ২০ বছর বয়সী রোনালদো দল বদলের বিশ্বরেকর্ড গড়ে যোগ দেন বার্সেলোনায়। স্প্যানিশ ক্লাবটির আক্রমণভাগটা বলতে গেলে একাই সামলানো রোনলাদো সে মৌসুমে ৪৯ ম্যাচে করেন ৪৭ গোল। প্রতিবার গোলের পর হাত মেলে তার উদযাপনে যেন মনে করিয়ে দিতেন তার জন্মস্থান রিও ডি জেনেইরোর বিখ্যাত যীশুমূর্তি ক্রাইস্ট দ্য রিডিমিরের কথা। সে বছরের শেষে ২০ বছর বয়সী রোনলাদো সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে জেতেন ফিফা প্লেয়ার অফ দ্য ইয়ার।

আরও পড়ুন: বিশ্বকাপে ভলান্টিয়ারশিপে রাজত্ব বাংলাদেশের

সে মৌসুমে কস্পোস্টেলারের বিপক্ষে করেন দুর্দান্ত এক গোল। যে গোলটি পরে নাইকি তাদের বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করে। সে বিজ্ঞাপনটিতে বলা হয়, ‘কল্পনা করো তুমি ঈশ্বরের কাছে সেরা ফুটবলার হওয়ার জন্য প্রার্থনা করছো এবং সে তোমার কথা শুনছে।’

এক মৌসুম বার্সায় কাটানোর পর বিশ্বরেকর্ড গড়ে তাকে দলে টানে ইতালিয়ান জায়ান্ট ইন্টার মিলান। দিয়াগো ম্যারাডোনার পর রোনালদো দ্বিতীয় খেলোয়াড়, যিনি দুবার ভাঙেন দলবদলের বিশ্বরেকর্ড। ইন্টারে প্রথম মৌসুমেই তিনি সিরি’ আর সর্বোচ্চ গোলদাতা হন। মৌসুমের শেষে দ্বিতীয়বারের মতো জিতে নেন ফিফা প্লেয়ার অফ দ্য ইয়ারের পুরস্কার। বছরের মাঝামাঝি জেতেন সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে ব্যালন ডি’ অর। দ্রুতই পেয়ে যান ইন্টার মিলানের নেতৃত্ব।

১৯৯৮ বিশ্বকাপে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন নিয়ে বিশ্বকাপে যান রোনালদো। ফ্রান্সের সে বিশ্বকাপে ফেবারিট ছিল রোনালদোর ব্রাজিল। বিশ্বকাপের মঞ্চে খেলতে যাওয়া রোনালদোকে নিয়ে জ্যাকব স্টেইনবার্গ দ্য গার্ডিয়ানে লেখেন, ১৯৯৮ সালে রোনালদোর মতো ভয়ংকর রকমের ট্যালেন্টেড কেউই ছিল না, যার মাঝে ছিল শক্তি, গতি আর স্কিলের  অতিপ্রাকৃত মিশ্রণ, যা তাকে পরিণত করেছিল সেই খেলোয়াড়ে যার মতো করে প্রতিটি শিশু মাঠে খেলতে চায়। মাত্র ২১ বছর বয়সে একটি জাতির স্বপ্ন ও আশা তার কাঁধে।

বিশ্বকাপে স্বপ্নের ফুটবল খেলতে থাকেন রোনালদো। ঠিক স্ট্রাইকারের ভূমিকায় না থেকে পালন করেন প্লেমেকারের দায়িত্ব। বিশ্বকাপে ৪ গোল ও ৩ অ্যাসিস্ট করে সবচেয়ে বেশি গোলে অবদান রাখেন রোনালদোই। তবে আজও রহস্য হয়ে আছে সে বিশ্বকাপের ফাইনালে তার পারফরম্যান্স।

ফাইনালের আগে অসুস্থতা বোধ করলে ম্যাচের মাত্র ৭২ মিনিট আগে দল থেকে বাদ দেয়া হয় রোনলাদোকে। এমনকি ফিফার অফিসিয়ালদের কাছে পাঠানো খেলোয়াড়দের তালিকাতেও ছিল না তার নাম। তবে ম্যাচ শুরুর ঠিক আগে কোচ মারিও জাগালোর কাছে সুস্থতা বোধ করছেন বলে খেলতে নামার অনুরোধ করেন তিনি।

বিশ্বকাপ ফাইনালে মাঠে নামলেও ফ্রান্সের বিপক্ষে তাকে খুঁজেই পাওয়া যায়নি। নিজের ছায়া হয়ে থাকা রোনালদোর বাজে পারফরম্যান্সে দল হারে ৩-০ গোলে। সে ম্যাচে রোনালদোকে খেলানো নিয়ে বাজারে অনেক ষড়যন্ত্রতত্ত্ব আজও ঘুরে বেড়ায়। সে বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে অবশ্য গোল্ডেন বল তিনিই লাভ করেন।

রোনালদো নাজারিও হাতেগোনা সেই ফুটবলারদের একজন, যিনি বিশ্বকাপের মঞ্চে জিতেছেন গোল্ডেন বল এবং গোল্ডেন বুট। ২০০২ বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার গোল্ডেন বুট জেতেন তিনি।

তবে অর্জনের পাশেই আছে ট্রাজেডি, যা হতে দেয়নি তাকে গ্রেটেস্ট অব অলটাইম। ইন্টার মিলানে যখন পরিপূর্ণ ফরোয়ার্ড হয়ে অমরত্বের পথে হাঁটছেন, ঠিক তখনই ভয়ংকর ইনজুরিতে ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যেতে বসেছিল তার।

১৯৯৯-২০০০ মৌসুমে লেচ্চের বিপক্ষে ম্যাচে হাঁটুতে ব্যথা অনুভব করেন তিনি। পরে পরীক্ষা করে দেখা যায়, রোনালদোর হাঁটুর একটি টেন্ডন ছিঁড়ে গেছে, যার দরুন তাকে অস্ত্রোপচার করতে হয়। এই ইনজুরি থেকে তিনি মাঠে ফেরেন ২০০০ সালের এপ্রিলে এবং প্রথম ম্যাচ খেলতে নেমে মাত্র ৬ মিনিটের মাথায় ফের ইনজুরিতে পড়েন। এ দফায় তার হাঁটুর ক্যাপের টেন্ডন সম্পূর্ণরূপে ছিঁড়ে যায়। রোনালদোর ফিজিওথেরাপিস্ট নিল্টন পেটেরন বলেন, ‘তার হাঁটুর ক্যাপ সত্যি বলতে বিধ্বস্ত হয়েছে। এটা আমার দেখা সবচেয়ে বাজে ফুটবল ইনজুরি।’ এ দফায় প্রায় দুবছর মাঠের বাইরে থাকেন রোনালদো। ফেরেন একদম ২০০২ বিশ্বকাপের আগে।

আরও পড়ুন: সমালোচকদের জবাব দেয়ার বিশ্বকাপ রোনালদোর

বিশ্বকাপের দলে রোনালদোর জায়গা নিয়েই রীতিমতো উঠেছিল প্রশ্ন। তবে কোচ লুই ফেলিপে স্কলারি ছিলেন পাশে। আগের তিনবছর ক্যারিয়ার বিধ্বংসী ইনজুরিতে ভোগা রোনালদো ফিরে এসে ইতিহাস তৈরি করেছিলেন। সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে ব্রাজিলকে উপহার দেন পঞ্চম বিশ্বকাপ।

ক্যারিয়ারে অসংখ্য সুন্দর গোল করেছেন রোনালদো। ইনজুরিতে একটা সময় বাধ্য হয়ে ডিবক্সে ঘুরাঘুরি করা ফক্স ইন দ্য বক্সে পরিণত হলেও স্কিলে ঠাসা ছিলেন এই কিংবদন্তি। গোলরক্ষককে ড্রিবল করে গোল করাটা তো তার কাছে নেশার মতোই ছিল। ক্যারিয়ারে গোলরক্ষকে কাটিয়ে করা গোলের সংখ্যাই ৮৮টি। ম্যাজিক্যাল স্কিলের জন্য বিখ্যাত রোনালদিনহো পর্যন্ত মানেন, স্কিলের দিক দিয়ে রোনালদোর ধারেকাছেও নেই কেউ। তিনি বলেন, ‘রোনালদো আমার আইডল, তার মতো কেউ হতে পারবে না, হি ইজ এ ম্যাজিক।’

ক্লাব পর্যায়ে বার্সেলোনা-রিয়াল মাদ্রিদ কিংবা ইন্টার মিলান-এসি মিলানের মতো চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাবের হয়ে সফল রোনালদোর বেলায় ঘুচে যায় সব দ্বন্দ্ব। এক বাক্যে মেনে নেয় তার শ্রেষ্ঠত্ব। তাইতো ওল্ড ট্রাফোর্ডে হ্যাটট্রিকের পর গোটা স্টেডিয়াম দাঁড়িয়ে সম্মান জানাতে একটুও কার্পণ্য করে না। মুগ্ধ রোনলাদোর বিদঘুটে চুলের স্টাইলও নিমিষেই ঝড় তোলে বিশ্বের বিভিন্ন কোণে, এমনকি এই দক্ষিণ এশিয়াতেও।

রোনালদো অনেক কিছু জেতার পরও তাই আক্ষেপের নাম। কী হতে পেরেছেন আর কী হতে পারতেন - এর মাঝে একটা কল্পনার জগৎ সৃষ্টি করে দিয়েছে বেরসিক ইনজুরি। মাত্র ৩৪ বছর বয়সে ক্যারিয়ার থেমে যাওয়ার আরও আগেই সেরা সময়টা পেছনে ফেলে এসেছিলেন। ইনজুরির কারণে গ্রহণ করা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আর হাইপোথাইরয়েডিজমে একসময় মুটিয়ে যেতে থাকেন। পেরে উঠছিল না শরীর। বাধ্য হয়ে ভালোবাসার ফুটবলটাকে বলতে হয়েছিল বিদায়। কিন্তু ফুটবল ইতিহাসে অমরত্বটা এটুকুতেই পাওয়া হয়ে গেছে তার।

একনজরে রোনলাদো: 

পুরো নাম: রোনালদো লুইস নাজারিও দি লিমা
জন্ম: ১৮ সেপ্টেম্বর ১৯৭৬, রিও ডি জেনেইরো
পজিশন: স্ট্রাইকার 
জাতীয় দল: ব্রাজিল (৯৮ ম্যাচে ৬২ গোল)
বিশ্বকাপ পারফরম্যান্স: ১৫ গোল (দ্বিতীয় সর্বোচ্চ)

]]>
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url