প্রভুত্ব বিস্তার নাকি অর্থনৈতিক সহযোগিতা, চীনা বিআরআইয়ের উদ্দেশ্য কী?

September 14, 2022 at 06:57AM
from somoynews.tv | RSS Feed
খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক থেকে অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত চীন থেকে শুরু করে পূর্ব ও পশ্চিম এশিয়া, ইউরোপ ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলকে সংযুক্ত করে বেশ কয়েকটি প্রাচীন বাণিজ্যপথ গড়ে ওঠে। এসব পথকে একত্রে সিল্ক রোড বা রেশম পথ বলে হয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী পূর্ব ও পশ্চিমের মেলবন্ধন হিসেবে কাজ করেছে এ রেশমপথ।
এ সিল্ক রুটের অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখে অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে বাকি বিশ্বের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বৃদ্ধির উদোগ গ্রহণ করেন চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। এ উদ্যোগকেই অভিহিত করা হচ্ছে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বা বিআরআই হিসেবে। আবার বিনিয়োগের নামে দরিদ্র দেশগুলোকে ঋণগ্রস্ত করে তাদের ওপর আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে চীন, পশ্চিমা মহলে বিআরআই এর বিরুদ্ধে এমন সমালোচনাও রয়েছে।
বিআরআই কি?
বিশ্বজুড়ে অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব বৃদ্ধির লক্ষ্যেই এ বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বা বিআরআই প্রকল্প হাতে নিয়েছে চীন। প্রথমে এ প্রকল্পকে ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড নামে বা ওবোর নামে অভিহিত করা করলেও পরবর্তীতে চীনা সরকার এ প্রকল্পকে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বা বিআরআই নামে অভিহিত করতে শুরু করে। ২০১৩ সালে কাজাখস্তান সফরকালে আনুষ্ঠানিকভাবে এ উদ্যোগের ঘোষণা দেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।
বিআরআই এর উদ্দেশ্য প্রাচীন রেশম পথের পুনরুজ্জীবন
আড়াই হাজার বছর আগে চীনের জিয়ান থেকে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল ও রোমান সাম্রাজ্য পর্যন্ত একটি সমৃদ্ধ বাণিজ্য পথ গড়ে উঠেছিল। যাকে সিল্ক রুট বা রেশমপথ নামেও অভিহিত করা হয়। এ সিল্ক রুটের পুনরুজ্জীবনই বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মূল লক্ষ্য বলে দাবি করছে চীন।
চীনের ইতিহাসে সিল্ক রুট ধরে গড়ে ওঠা বাণিজ্যের এ সময়কে গোল্ডেন এজ বা স্বর্ণযুগ নামেও অভিহিত করা হয়।
সেই হারানো সিল্ক রুটের অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখে বাকি বিশ্বের সঙ্গে কানেক্টিভিটি ও নিজের অর্থনৈতিক নেতৃত্বকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে চায় চীন।
বিআরআই পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার প্রতি চীনা চ্যালেঞ্জ
সাম্প্রতিক বিশ্বের অর্থনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ও উচ্চভিলাষী অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক প্রকল্প হিসেবে চীনের এ বিআরআই প্রজেক্টকে অভিহিত করা হয়। চীনের এ প্রকল্প এমন এক সময়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে, যখন পশ্চিমা অর্থনৈতিক শক্তিগুলো চীনের অর্থনৈতিক সক্ষমতার কাছে একটু একটু করে জায়গা হারাচ্ছে।
পাশাপাশি তাইওয়ান ইস্যুকে কেন্দ্র করে চীনের মুখোমুখি অবস্থান গ্রহণ করা যুক্তরাষ্ট্র ও তার সমর্থনপুষ্ট পূর্ব এশিয়ার মিত্রদের বিরুদ্ধেও বিআরআইকে ব্যবহার করছে চীন।
আরও পড়ুন: বন্ধ নর্ডস্ট্রিম ওয়ান: ইউরোপের জ্বালানির ঘুঁটি মস্কোর হাতেই
যুক্তরাষ্ট্রের মার্শাল প্ল্যানের চীনা সংস্করণ বিআরআই
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিধ্বস্ত ইউরোপকে পুনর্গঠনে যুক্তরাষ্ট্র যে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণ করে তাকে মার্শাল প্ল্যান নামে অভিহিত করা হয়। শি জিনপিং এর বিআরআই প্রকল্পকে চীনের মার্শাল প্ল্যান হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে।পরিধির দিক থেকে যা মার্শাল প্ল্যানের থেকেও বিস্তৃত।
মার্শাল প্ল্যান ছিল কেবল ইউরোপকে কেন্দ্র করে। আর বেল্ট অ্যান্ড রোড বিস্তৃত এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকা জুড়ে।
বিআরআইয়ের রুট
৩টি ভিন্ন ভিন্ন রুট বা বেল্ট ধরে চীন বিআরআই বাস্তবায়ন করছে। এগুলোকে উত্তর রুট, কেন্দ্রীয় রুট ও দক্ষিণ রুট হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে।
চীন থেকে শুরু হয়ে মধ্য এশিয়া হয়ে রাশিয়া ও ইউরোপের মধ্য দিয়ে যাওয়া সড়ক ও রেলরুটকে উত্তর রুট হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। মধ্য এশিয়ার ভেতর দিয়ে পশ্চিম এশিয়া, পারস্য উপসাগর এবং ভূমধ্যসাগরের রুটকে বলা হচ্ছে কেন্দ্রীয় রুট।
এছাড়া সমুদ্রপথে চীন থেকে শুরু হয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া হয়ে ভারত মহাসাগরের পথ ধরে ভূমধ্যসাগরে প্রবেশ করা রুটকে বলা হচ্ছে দক্ষিণ রুট।
উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিআরআইয়ের প্রভাব
এশিয়া ও আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে চীনের এ বিআরআই প্রকল্প ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে। যার প্রমাণ পাওয়া যায় ২০১৮ সালে চীনের রাজধানী বেইজিং-এ অনুষ্ঠিত হওয়া রোড অ্যান্ড বেল্ট ইনিশিয়েটিভ ফোরামের দুইদিন ব্যাপী সম্মেলনে। এ সম্মেলনে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফসহ বিশ্বের প্রায় ৩০টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানরা যোগ দিয়েছিলেন।
চায়না পাওয়ারে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ২০১৯ সালের অক্টোবর মাসের তথ্য অনুযায়ী, চীনের এ বিআরআই প্রকল্পে বিশ্বের ১৪৮টি দেশ যুক্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে এ দেশগুলোর জিডিপি ২৯ লাখ কোটি ডলার। এ দেশগুলোতে বাস করে ৪৬০ কোটি মানুষ। যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৬১ শতাংশ। পাশাপাশি বিআরআইভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে চীনের ২০১৪ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ৬ ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হয়েছে।
বিআরআইয়ের পেছনে চীনের উদ্দেশ্য
প্রকল্পটি চীনের জন্য উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুবিধা বয়ে এনেছে। চীনের ক্রমবর্ধমান রফতানির বাজার এ উদ্যোগের পথ ধরে আরও সম্প্রসারিত হচ্ছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে চীনের মুদ্রা রেনমিনবির অবস্থান আরও জোরদার হয়েছে।
এছাড়াও চীন আরও অন্যান্য সুবিধা অর্জন করেছে যা খুব একটা আলোচিত হয়নি। যেমন- চীনের সিমেন্ট, স্টিল এবং নির্মাণ প্রতিষ্ঠানসহ অবকাঠামো খাত সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো এ প্রকল্পের সুবিধাভোগী হয়েছে।
অপরদিকে অব্যাহত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে দীর্ঘদিন ধরেই চীনের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে অলস পুঁজি জমেছিল। তারা বিআরআইভুক্ত দেশগুলোতে সে পুঁজি বিনিয়োগের সুযোগ পেয়েছে তারা।
চীনকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুবিধা দেবে বিআরআই
প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং চীনের সঙ্গে বাকি বিশ্বের যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে বিআরআইকে অভিহিত করলেও বিশ্বে চীনাদের প্রভাব বাড়ানোই এর মূল লক্ষ্য বলে পশ্চিমা মহলে সমালোচনা রয়েছে।
আরও পড়ুন: দরিদ্র দেশের জন্য আইএমএফের ঋণ আশীর্বাদ না অভিশাপ?
বৈশ্বিক অবকাঠামো উন্নয়নের আড়ালে চীনা সরকারের নেয়া আগ্রাসী পররাষ্ট্র নীতির একটি কৌশল হিসেবেও বিআরআইকে অভিহিত করে থাকে পশ্চিমা বিশ্ব।
তবে নিরপেক্ষভাবে দেখলে এটি পরিষ্কার যে বিআরআই প্রকল্প সফলভাবে সম্পন্ন হলে এর মাধ্যমে বিশ্বের অর্থনীতির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ চীনের মুখাপেক্ষী হবে। পাশাপাশি চীন ও ইউরেশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে এ দেশগুলো আরও বেশি করে চীনমুখী হবে। এর ফলে এ দেশগুলোর ওপর চীনের অর্থনৈতিক প্রভুত্ব বৃদ্ধি পাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এইডডেটার তথ্য অনুসারে, চীন বছরে ৮৫ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক বিনিয়োগ করছে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগের দ্বিগুণ।
বিআরআই কি চীনা ঋণের ফাঁদ
চীনের বিআরআই এর অধীনে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানে বাস্তবায়িত হচ্ছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে শ্রীলংকা দেউলিয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে পাকিস্তানও দেউলিয়া হওয়ার পথে। দেশ দুইটির অর্থনীতির এ বেহাল অবস্থার পেছনে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নানা দিক থাকলেও বিআরআইয়ের অধীনে দেশগুলোতে দেয়া চীনা ঋণকেও দায়ী করা হচ্ছে। একই রকমভাবে বিশ্বের অন্যান্য অংশে চীনা ঋণগুলোও বিতর্কের মধ্যে পড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, চীনারা ঋণের চুক্তিগুলো এমনভাবে করে থাকে যে, শেষ পর্যন্ত ঋণ ব্যবহার করে দেশগুলো সময়মতো শোধ করতে না পারলে সে দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ চীনকে দিয়ে দিতে হয়।
বিআরআইয়ের জবাবে পশ্চিমাদের পাল্টা প্রকল্প
চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পের কারণে ধীরে ধীরে নিজেদের অর্থনৈতিক প্রভুত্বের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ায় স্পষ্টতই অস্বস্তিতে পশ্চিমা বিশ্ব। বিআরআইয়ের জবাবে পাল্টা কর্মসূচি নিয়েও মাঠে নেমেছে তারা।
আগামী ৫ বছরে ৫০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের তহবিল গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশগুলোর সংগঠন গ্রুপ অব সেভেন বা জি-৭।
বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরিতে অর্থায়ন ও সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গত ২৬ জুন জার্মানিতে উদ্যোগের বিষয়টি জি-৭ ভুক্ত দেশগুলো চূড়ান্ত করে। সেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও জি-৭ ভুক্ত অন্যান্য দেশের নেতারা মিলিত হন।
ওই বৈঠকেই 'পার্টনারশিপ ফর গ্লোবাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট' নামক এ উদ্যোগের ব্যাপারে সম্মত হন তারা। এ উদ্যোগকে বিআরআইয়ের পাল্টা পশ্চিমা ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
]]>