মাত্র ১০ বছর বয়সে পবিত্র কোরআনের ৩০ পারা মুখস্ত করেন তিনি


January 17, 2022 at 05:27AM
from somoynews.tv | RSS Feed

ইতিহাসের পাতায় উল্লেখিত অন্যতম সেরা গুণী ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম একজন হলেন ইবনে সিনা । তাঁর পুরো নাম আবু আলী হোসাইন ইবনে আবদুল্লাহ আল হাসান ইবনে আলী ইবনে সিনা। বলা হয় তাকে ইতিহাসের অন্যতম সেরা চিকিৎসাবিজ্ঞানী, গণিতজ্ঞ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং দার্শনিক। ইরান, তুরস্ক, আফগানিস্তান, রাশিয়াসহ অন্যান্য দেশের বিজ্ঞজনেরা এই মহৎপ্রাণ দার্শনিককে তাদের জাতীয় জ্ঞানবীর হিসেবে দাবি করে।

তিনি জন্মগ্রহণ করেন আনুমানিক ৯৮০ খ্রিস্টাব্দে। বাস করতেন উজবেকিস্তানের বিখ্যাত শহর বোখারার নিকটবর্তী আফসানা গ্রামে। ছোটবেলা থেকেই তার মধ্যে লুকিয়ে ছিল অসামান্য মেধা ও প্রতিভা। মাত্র ১০ বছর বয়সেই তিনি পবিত্র কোরআনের ৩০ পারা মুখস্ত করে ফেলেন। ১৭ বছর বয়সে  এরিস্টটলের দর্শন সম্পূর্ণ ধাতস্থ করেন।

ইবনে সিনা তরুণ বয়সেই শিক্ষকতা শুরু করেন,বিভিন্ন দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা তার কাছে পড়তে আসত।এরপর তিনি চিকিৎসাবিদ্যা সম্পর্কিত বই সংগ্রহ করে গবেষণা করতে শুরু করেন। একবার বোখারার বাদশাহ নুহ বিন মনসুর এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হন। সব চিকিৎসক এই চিকিৎসায় ব্যর্থ হয়। ততদিনে সিনার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে সব জায়গায়। ইবনে সিনা বাদশাহকে সম্পূর্ণ সারিয়ে তুলেন। তার খ্যাতি এ সময় দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে। আরোগ্য লাভের পর বাদশাহ ইবনে সিনাকে পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা করেন। কিন্তু ইবনে সিনা কেবল বাদশাহর দরবারের গ্রন্থাগারে প্রবেশ করে পড়াশোনার অনুমতি প্রার্থনা করেন। বাদশাহ তার এ প্রার্থনা মঞ্জুর করেন। এভাবেই ইবনে সিনা শাহী গ্রন্থাগারে প্রবেশের সুযোগ পান। গ্রন্থাগারের ভিতরে গিয়ে অবাক হয়েছিলেন সিনা। কারণ এমন সব বইয়ের সন্ধান তিনি সেখানে পেয়েছিলেন যেগুলো এর আগে কোনো দিনও দেখেননি এবং এরপরেও কখনো দেখেননি। প্রাচীন থেকে শুরু করে সব লেখকের বইয়ের অমূল্য ভাণ্ডার ছিল এই গ্রন্থাগার। সব লেখকের নাম তাদের রচনাসমূহের বিস্তারিত বর্ণনা তৈরির পর তিনি সেগুলো অধ্যয়ন করতে শুরু করেন।

আরও পড়ুন. শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রয়াণ দিবস আজ

মাত্র ১৯ বছর বয়সে তিনি বিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস, অর্থনীতি, রাজনীতি, গণিতশাস্ত্র, জ্যামিতি, ন্যায়শাস্ত্র, চিকিৎসাশাস্ত্র, কাব্য, সাহিত্য প্রভৃতি বিষয়ে অসীম জ্ঞানের অধিকারী হন। ২১ বছর বয়সে ‘আল মজমুয়া’ নামক একটি বিশ্বকোষ রচনা করেন।শুধু গণিতশাস্ত্র ছাড়া প্রায় সব বিষয় লিপিবদ্ধ করেছিলেন।

১০০৪ থেকে ১০১০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি খাওয়ারিজমে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করেন। ইবনে সিনার সুখ্যাতি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়লে গজনির সুলতান মাহমুদ তাকে পেতে চাইলেন। এ উদ্দেশে সুলতান মাহমুদ তার প্রধান শিল্পী আবু নসরের মাধ্যমে ইবনে সিনার ৪০টি প্রতিকৃতি তৈরি করে। আসল সিনাকে খুঁজে বের করার জন্য দেশে-বিদেশে সুলতান মাহমুদ লোক পাঠিয়ে দিলেন। কিন্তু স্বাধীনচেতা ইবনে সিনা পালিয়ে চলে যান ইরানের দিকে হামাদান শহরে। হামাদানের সুলতান অসুস্থ হলে ইবনে সিনা তার চিকিৎসা করেন। এতে সম্রাট আরোগ্য লাভ করেন। এই চিকিৎসায় খুশি হয়ে সম্রাট তাকে প্রধানমন্ত্রীর পদে নিয়োগ দেন। কিন্তু রাজনীতিতে তিনি বরাবরের মতোই ছিলেন অপরিপক্ব। তাই এই পদ-প্রাপ্তি তার জীবনে নতুন বিড়ম্বনার সৃষ্টি করে। তাদের সঙ্গে ইবনে সিনার বিরোধ হয়। সেনাধ্যক্ষ সিনাকে গ্রেফতার করার জন্য সম্রাটের কাছে আবেদন জানাতে থাকেন। সৈন্য বাহিনীর প্রধানের অনুরোধ উপেক্ষা করার সাধ্য সম্রাটের ছিল না। তাই তিনি ইবনে সিনাকে নির্বাসন দণ্ড দিয়ে অন্য এক স্থানে কারাবন্দী করে রাখেন।আর হামাদানে বসেই ইবনে সিনা গ্রন্থ কিতাব আল ইশারাৎ রচনা করেন।

এছাড়া ইবনে সিনা অনেক দেশ ভ্রমণ করেছিলেন। তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ নগরী খোয়ারিজমে গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে তার সঙ্গে পণ্ডিত আল বেরুনির সাক্ষাৎ হয়। আল বেরুনির উৎসাহ ছিল ভারতবর্ষ নিয়ে। কিন্তু ইবনে সিনা কখনো ভারত অভিমুখে আসেননি। তিনি যাত্রা করেছিলেন ভারতবর্ষের উল্টো দিকে অর্থাৎ পশ্চিম দিকে। তার মূল উৎসাহও ছিল পশ্চিমের দিকে।

এদিকে ইতিহাস থেকে জানা যায়, ইবনে সিনার চিকিৎসাবিজ্ঞান সংক্রান্ত বইগুলো প্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে পাশ্চাত্য জগতে স্থায়ী অবস্থান তৈরি করে নিয়েছিল। খোয়ারিজম শহর থেকে বিদায় নিয়ে তিনি রাজধানী শহর গুরুগঞ্জে উপস্থিত হন। এই শহরে ইবনে সিনা তার জীবনের বেশ কিছু সময় অতিবাহিত করেন। বলে রাখা দরকার যে, এখানে অবস্থানকালেই চিকিৎসাবিদ্যা বিষয়ে তার অমর গ্রন্থ কানুন ফিত-থিব রচনা করেন। তাই এই সফর ইবনে সিনার জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

আরও পড়ুন. বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত ধূমকেতু ‘হ্যালির ধূমকেতু’

খোরাসান শহর থেকে ইরানে যাওয়ার পথে ইবনে সিনা তার সমসাময়িক কবি ফেরদৌসীর জন্মস্থান বিখ্যাত তুস নগরী পরিদর্শন করেন। এখান থেকে তিনি ইরানের সুপ্রাচীন শহর হামাদানে গমন করেন। ঐতিহাসিক নগরী ছিল শহর হামাদান, তাই ভালো লেগে গিয়েছিল ইবনে সিনার। তিনি এই শহরে অনেকদিন ছিলেন। দেশ-বিদেশ ভ্রমণ করে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। এদিকে তার বয়সও হয়েছিল অনেক। তাই তিনি মানসিক ও শারীরিক প্রশান্তি খুঁজছিলেন। আর এই হামাদান শহরই ছিল তার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। তিনি এই শহরেই প্রশান্তি খুঁজে পান।

হামাদানের সম্রাটও ইবনে সিনাকে সমাদরে গ্রহণ করেছিলেন। তার থাকা-খাওয়া ও নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। তিনি তখন চিকিৎসাসেবার মাধ্যমে স্বাধীন জীবিকা উপার্জন করতেন।সারা দিন চিকিৎসা পেশার পর রাতে তিনি অভিজাত ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে আড্ডা দিতেন। গম্ভীর মূর্তিতে বসে থাকা তার স্বভাবে ছিল না।ইবনে সিনা ছিলেন স্বাধীনচেতা ও আত্মমর্যাদা সচেতন ব্যক্তি। জীবনের নানা উত্থান পতনের মধ্যেও তিনি কখনো জ্ঞানচর্চা করা ছাড়েন নি।জ্ঞান চর্চাই ছিল তার মূখ্য কাজ। এক যুদ্ধ শিবিরে অবস্থান কালে তিনি তলপেটের ব্যাথায় কাবু হয়ে পড়েন। এই রোগেই ইবনে সিনা ১০৩৭ খৃস্টাব্দে, মাত্র ৫৮ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।
 

]]>
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url