শিয়াল পালন করা সেই পরিবারকে ‘সান্ত্বনা’য় পচা পণ্য দেওয়ার অভিযোগ

January 09, 2022 at 11:45PM
from jagonews24.com | rss Feed
লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার বেদে দম্পতি মো. রুবেল ও হাসিনা আক্তারের কাছ থেকে সন্তানের মতো পালন করা শিয়ালটি অবমুক্ত করা হয়েছে। সন্তানের স্নেহে পালন করা শিয়ালটি নেওয়ার বিনিময়ে তাদেরকে কিছু খাবার দিয়ে সান্ত্বনা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। তাদেরকে দেওয়া চালসহ অন্য খাবারগুলো পচা বলে দাবি করেছেন হাসিনা আক্তার। রোববার (৯ জানুয়ারি) রাত সাড়ে ৯টার দিকে মোবাইলফোনে তিনি বিষয়টি জানিয়েছেন।
এদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. কামরুজ্জামান বলেন, খাবারগুলো পচা ছিল কিনা, আমার জানা নেই। তবে বিষয়টি দেখছি। আমি কিছুক্ষণের মধ্যে তাদের বাড়িতে যাবো। খাবারগুলো পচা হলে পাল্টে দেবো। যেকোন সহযোগিতার জন্য আমার সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য বলেছি। তাদের শিশুদের জন্য প্রতিবন্ধী ভাতার কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন। এছাড়া সরকারিভাবে ভেড়া বা ছাগল দেওয়ার জন্য চেষ্টা করছি। শীত নিবারণের জন্য তাদের বাড়িতে গিয়ে আমি কম্বল দিয়ে আসবো।
তিনি জানান, সম্প্রতি হাজিরহাট বাজারে একটি শিয়াল জবাই করে মাংস বিক্রি করা হয়েছে। বেদে পরিবারে পালিত শিয়ালটিও জবাই করার পাঁয়তারা চলছে। এ খবরটি শুক্রবার (৭ জানুয়ারি) একজন গণমাধ্যমকর্মী তাকে জানান। শিয়াল জবাই বা বন্যপ্রাণী খাঁচায় পালন অপরাধ হওয়ায় তিনি বন বিভাগকে নির্দেশ দেন বেদে পরিবারের কাছ থেকে শিয়ালটি নিয়ে আসার জন্য। পরে উপজেলার চর ফলকন গ্রামের সেই বাড়ি থেকে শিয়ালটি উদ্ধার করে শুক্রবারই স্থানীয় জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
ইউএনও আরও জানান, স্থানীয়রা জানিয়েছে শিয়ালটি জবাইয়ের উদ্দেশ্যে নয়, বরং এটি গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে পরিবারটি লালন করে আসছে। ওই পরিবারেই পোষা প্রাণী ছিল শিয়ালটি। সন্তানের মতো লালিত প্রাণীটির প্রতি তাদের মায়া প্রবল। কিন্তু আইনে অপরাধ হওয়ায় একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে প্রাণীটি অবমুক্ত করেছি। কারণ শিয়াল বন্যপ্রাণী। এটি ঘরে আটকে রাখা আইনসিদ্ধ নয়।
বাংলাদেশের ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনের তফসিল-১ অনুযায়ী প্রাণীটিকে সংরক্ষিত ঘোষণা করা হয়েছে।
রুবেল ও হাসিনার পরিবারটি মূলত একসময় বেদে পরিবার ছিল। কয়েক বছর ধরে তারা ফলকন গ্রামে বসবাস করছেন। তাদের দুই সন্তান রবিন ও রাহান। দুজনই প্রতিবন্ধী। শিয়ালটিকে তাদের বন্ধু হয়ে উঠেছে। তাদের দিন কাটতো শিয়ালটির সঙ্গে খেলাধুলা করে। কিন্তু গত তিনদিন প্রাণিটির জন্য কান্না করতে করতে তারা এখন অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এই তিনদিন হাসিনা নিজেও কাজে বের হতে পারেননি।
রুবেল বলন, এক বছর আগে তারা দুটি শিয়ালের বাচ্চা কিনেছিলেন পরিবারে লালন পালনের জন্য। এরমধ্যে একটি মারা যায়। আরেকটিকে আমি গরীব হয়েও দুধ, মাছ, মাংস খাইয়ে বড় করছিলাম। তার জন্য দুই হাজার ২০০ টাকা দিয়ে খাঁচা বানিয়েছি। আমার দুই সন্তানের কাছে সে ছিল বন্ধুর মতো। কে বা কারা প্রশাসনের কাছে এ নিয়ে উল্টাপাল্টা বলায় তারা এটি নিয়ে গেছে। এরপর থেকে দু’বাচ্চার কান্না থামছে না।
তিনি জানান, মানুষ পশু-পাখি কত কিছুই শখ করে পালন করে। আমি গরীব মানুষ। শিয়াল পালন অপরাধ কিনা তাতো জানি না। বিক্রি করতে দেখে আমি শিয়ালগুলো কিনে আনি। একটি মরে গেলেও আরেকটিকে পালন করে বড় করেছি। আমার দুই ছেলেরও খুব প্রিয় হয়ে ওঠে শিয়ালটি।
হাসিনা ঘরে শিয়ালটির দেখভাল করতেন। শুক্রবার দুপুরে বনবিভাগের কর্মকর্তারা তার বাড়ি গিয়ে শিয়ালটি নিয়ে আসার পর তিনি ও তার দুই প্রতিবন্ধী সন্তান ছুটে আসেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনে। সেখানে শিয়ালের জন্য তার কান্নার দৃশ্য ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং এ দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বনবিভাগের কর্মকর্তারা তাকে বুঝিয়ে আবার বাড়িতে ফেরত পাঠান।
হাসিনা বলেন, আমি গ্রামে-গ্রামে গিয়ে বাত ব্যাথা কমানোর জন্য সিঙ্গা দেই। প্রতিদিন যা আয় হতো তার তিন ভাগের একভাগ শিয়ালটির পেছনে খরচ করতাম। আমার সন্তানের মতোই তাকে গোসল করাতাম। বিভিন্ন খাবার কিনে খাওয়াতাম। কে বা কারা ইউএনওকে বলেছে আমরা নাকি শিয়ালটিকে জবাই করবো। এজন্য লোকজন এসে শিয়ালটিকে নিয়ে গেছে। আমার আশপাশের বাসিন্দারা বুঝিয়েছে প্রশাসনের লোকজনকে। কিন্তু শিয়ালটি আমাদের ফেরত দেওয়া হয়নি।
তিনি আরও বলেন, শিয়ালটির পরিবর্তে আমাকে চাল, ডাল, তেল, চিড়া, চিনি, নুডলস দেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে তেল ও চিনি ছাড়া বাকিগুলো পচা।
প্রসঙ্গত, জাগো নিউজে ৭ জানুয়ারি 'সন্তানের স্নেহে পালিত শিয়ালটির জন্য কাঁদছেন হাসিনা আক্তার' শিরোনামে ছবিসহ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়।
কাজল কায়েস/কেএসআর