ভালো থাকবেন বাংলা সিনেমার মিয়া ভাই...

May 16, 2023 at 06:34AM
from somoynews.tv | RSS Feed
মিয়া ভাই। কী এক আদুরে সম্মোধন। আমাদের সেই আদরের মিয়া ভাই, পরম শ্রদ্ধার মানুষ, চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা, সংসদ সদস্য, আকবর হোসেন পাঠান ফারুক আর নেই। তিনি এখন না ফেরার দেশের বাসিন্দা। সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৫ মে বাংলাদেশ সময় সকাল ৮টায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন (ইন্নালিল্লাহে... রাজেউন)।
আকবর হোসেন খান পাঠান ফারুক। আমাদের চলচ্চিত্রের প্রিয় তারকা। গ্রামীণ জনজীবনের প্রায় প্রতিটি চরিত্রে তিনি বেশ মানিয়ে গিয়েছিলেন। আমজাদ হোসেনের ‘নয়নের মনি’, ‘সুজন সখি’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, মিতার ‘লাঠিয়াল’, ‘আলোর মিছিল’, খান আতাউর রহমানের ‘আবার তোরা মানুষ হ’, আব্দুল্লাহ আল মামুনের ‘সারেং বৌ’সহ অসংখ্য কালজয়ী ছবিতে অভিনয় করেছেন ফারুক। প্রতিটি ছবিতেই তার অসাধারণ অভিনয় দর্শককে মুগ্ধতায় ভরিয়ে রেখেছে। ১৯৪৮ সালের ১৮ আগস্ট ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন ফারুক। ১৯৭১ সালে এইচ আকবর পরিচালিত ‘জলছবি’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তার অভিনয় জীবন শুরু। প্রথম সিনেমায় তাঁর বিপরীতে ছিলেন কবরী।
চলচ্চিত্রের মানুষজন ফারুককে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও আদর করে ডাকতেন মিয়া ভাই বলে। তিনি হলেন বাংলা চলচ্চিত্রের মিয়া ভাই। মিয়া ভাই এক অর্থে সংসারের অভিভাবক। আস্থার জায়গা। নায়ক ফারুকও আমাদের চলচ্চিত্রের আস্থার জায়গা ছিলেন। চলচ্চিত্র পরিবারের অভিভাবক ছিলেন তিনি।
ছিলেন অভিনেতা। হয়েছেন সাংসদ। দারুণ ব্যস্ততা। তবে তার সব ব্যস্ততা ও ভাবনার জায়গা জুড়ে চলচ্চিত্রই গুরুত্বপূর্ণ। করোনাকালীন দুঃসময়ের আগে একদিন চ্যানেল আই ভবনে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল। একটু যেন বিরক্ত ছিলেন আমাদের চলচ্চিত্রের বর্তমান অবস্থা নিয়ে। প্রসঙ্গ তুলতেই বলেছিলেন, এত বড় একটা ইন্ডাস্ট্রি। অনেক মানুষের রুটিরুজি এখানে নির্ভর করে। অথচ তেমন কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই ইন্ডাস্ট্রিটা চলছে। এভাবে চললে তো আমাদের দেশে চলচ্চিত্র বলে কিছু থাকবে না। কথা বলতে বলতে যেন স্মৃতির ঝাঁপি খুলে দিলেন, ‘আপনি যে কাজটা করে সংসার চালান, যে কাজের জন্য মানুষ আপনাকে ভালোবাসে, পছন্দ করে সেই কাজটিকে উপাসনার মতো গুরুত্ব দিতে হবে।’
আরও পড়ুন: আমজনতার কী হবে
‘অভিনয় আমার কাছে ইবাদতের সমান। আর তাই আমরা অনেক নিয়ম কানুনের মধ্যে চলচ্চিত্রের জন্য কাজ করেছি। চলচ্চিত্রে কল টাইমটা হলো বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সকাল ১০টা মানে ৯টা ৫৯ মিনিট। আমি যখন চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য অনেক ব্যস্ত সময় পার করেছি তখন সময়কেই গুরুত্ব দিয়েছি। একটা কথা মাথায় রাখতে হবে চলচ্চিত্রের একটা ইউনিটে অনেক মানুষের দরকার হয়। কমপক্ষে ৭০/৮০ জনের একটা ইউনিট থাকে। কাজেই একজন আর্টিস্টও যদি সময়মতো শুটিং সেটে না আসে তাহলে ওই ৭০/৮০ জন মানুষ তার জন্য অপেক্ষা করে। ফলে সময় মতো কাজ শুরু করা যায় না। এর ফলে ছবির বাজেট বাড়ে। সব চেয়ে বড় কথা শুটিংয়ে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার জায়গা তখন আর থাকে না।’
একটা উদাহরণ দিতে গিয়ে ফারুক বলেন, একটি ছবিতে অভিনয়ের জন্য ডেট দিয়েছি। আমাকে বলা হলো বেলা ১১টায় কল টাইম। জিজ্ঞেস করলাম, এটা কি সবার জন্য নির্ধারিত? তখন বলা হলো, না মানে... অন্যান্য অভিনেতা, অভিনেত্রীর জন্য সকাল ১০টা। কিন্তু বোঝেনই তো সবাই কল টাইমে আসে না। তাই আপনার জন্য...।
তাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, আমি সকাল ১০টায় আসব। যথারীতি সকাল ১০টায় শুটিং স্পটে হাজির হয়ে দেখি টেকনিক্যাল লোকজন ছাড়া আর কেউ আসেনি। আমাকে দেখে সবাই একটু যেন দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দিলেন। তখনও পরিচালক আসেননি। পরিচালকের একজন সহকারী দৌড়ে এসে বললেন, স্যার আপনি এত তাড়াতাড়ি এসে পড়েছেন...।
তাকে প্রশ্ন করলাম, কল টাইম কয়টা? সে বলল, সকাল ১০টা। তাকে বললাম, আমি তো কল টাইমেই এসেছি। সে হাত কচলাতে কচলাতে বলল, স্যার বোঝেনই তো সবাই কল টাইমে আসে না। নায়কের ফোন বন্ধ পাচ্ছি। নায়িকা কেবল ঘুম থেকে উঠেছে...।
বলা বাহুল্য, ছবির নায়ক সেদিন শুটিং স্পটে এসেছিলেন দুপুর দেড়টায়। তার একটু আগে নায়িকা আসেন। দেখলাম দেরি করে আসার জন্য কোনো এক্সকিউজ নেই। বরং বিরক্ত। মুড ভালো নেই। শেষমেশ শুটিং শুরু হলো বিকেল ৪টায়। সন্ধ্যার আগে নায়ক ‘আসছি’ বলে ওই যে গেল সেদিন আর এলোই না...।
আরও পড়ুন: ঝড় হলেই খুঁজতে থাকি ওই বাচ্চা মেয়েটির মুখ
ঘটনাটা বলতে বলতে নায়ক ফারুক বেশ উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বললেন, আমি জোর দিয়েই একটা কথা বলি, আমাদের সিনেমার শুটিংয়ে যতদিন না কল টাইম গুরুত্ব পাবে, ততদিন হাজার চেষ্টা করেও চলচ্চিত্রের উন্নতি করা যাবে না। কল টাইম হলো একটা কমিটমেন্টের জায়গা। কথা দিচ্ছি ১০টায় হাজির হবো। আপনার জন্য ৭০/৮০ জন মানুষ অপেক্ষায় বসে আছে। আপনি এলেন দুপুরের পর। মেকআপ নিলেন একঘণ্টা ধরে। শুটিং শুরু হলো বিকেলে। তখন কি অপেক্ষা করা মানুষগুলোর ধৈর্য্য থাকে? না থাকে না। তখন ‘ধর মার কাট’ শুরু হয়। এভাবে তো ভাই ভালো ছবি হবে না।
সেদিন আমাদের সিনেমার মানুষদের মধ্যে দলাদলির ব্যাপারটাকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছিলেন আকবর হোসেন পাঠান ফারুক। একটা জায়গায় অনেক মানুষের জমায়েত হলে নানান মত ও পথের কথা উঠবে। তাই বলে প্রকাশ্য দলাদলি তো কাম্য নয়। আমাদের চলচ্চিত্রাঙ্গনে কাজের চেয়ে দলাদলি বেশি। একটা ভালো ছবি নির্মাণের কোনো প্রতিযোগিতা নেই। বরং প্রতিযোগিতা আছে কে কাকে দেখে নেবে তার। এভাবে তো একটা ইন্ডাস্ট্রি দাঁড়াবে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রতাপের যুক্তি তুলে অনেকে বলেন, সিনেমায় দর্শক কমে গেছে। আমি এই বক্তব্যের বিরোধিতা করছি। সিনেমার দর্শক মোটেই কমেনি। আমরা বরং ভালো সিনেমা বানাতে পারছি না। ভালো সিনেমার সংজ্ঞা নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। মোটা দাগে আমি বিশ্বাস করি সেটাই ভালো সিনেমা যেখানে জীবনের বাস্তবতা উঠে আসে সুনিপুণভাবে। এক্ষেত্রে সময়টা খুবই গুরুত্বপুর্ণ। ৬০, ৭০, ৮০-র দশকের ভাবনা চিন্তায় ছবি বানালে এখন দর্শক নেবে না। কারণ আমাদের সমাজ জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। এ কথা মাথায় রেখেই ছবি নির্মাণ করতে হবে। ক’জন সেই কাজটা করছে?
এখন তো ভাই সিনেমায় রমনা পার্কের প্রেম দেখালে চলবে না। প্রেমের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে...।
নায়ক ফারুক, আমাদের চলচ্চিত্রের মিয়া ভাই সেদিন আরও অনেক কথা বলেছিলেন। তার প্রতিটি কথায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল আমাদের চলচ্চিত্র পরিবার। সবাই যেন এক সঙ্গে থাকে... এক সঙ্গে কাজ করে...।
আজ নায়ক ফারুক নেই। মিয়া ভাই নেই। আমরা অনেকেই তাকে নিয়ে অনেক কথা বলব। অনেক স্মৃতি রোমন্থন করব। কিন্তু তিনি বাংলা সিনেমার জন্য, বাংলা সিনেমার উন্নয়নের জন্য যে আন্তরিক স্বপ্ন দেখেছিলেন তা কি আদৌ বাস্তবে রূপ নেবে? না ফেরার দেশে অনেক ভালো থাকবেন মিয়া ভাই...।
লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক, আনন্দ আলো।