মুরগির মাংসের ভাগ

March 12, 2023 at 04:49AM
from somoynews.tv | RSS Feed
গোটা বিশ্বেই এখন চলছে এক ধরনের সংকট। খাদ্যদ্রব্যের স্বল্পতার পাশাপাশি আছে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার বাস্তবতা। ইউরোপের অনেক দেশেই নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। সেই সংকট থেকে বেঁচে যাওয়ার কোনো বাস্তব কারণ নেই বাংলাদেশেরও। একদিকে করোনা অন্যদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সবকিছু মিলিয়েই তৈরি হয়েছে এ সংকট। কিন্তু এক্ষেত্রে বাংলাদেশের একটি ইউনিক চরিত্র আছে।
সেই চরিত্রটা হচ্ছে আমাদের প্রাকৃতিক শক্তি। উন্নত দেশ না হবার সুবিধাও বলা যেতে পারে। এখনও আমাদের দেশের মানুষেরা যে কোনো কাজ করতে অভ্যস্ত। নিম্ন আয়ের মানুষগুলো বেঁচে থাকার তাগিদে সামনে যে কাজ পায় সেটিকেই পেশা হিসেবে মেনে নিতে ইতস্তত করে না। আরেকটা বিষয় হচ্ছে, আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ। মানুষের বাড়ির আশপাশে খালি জমি, পুকুর বা খাল নেই এমন এলাকা কম আছে। সেই জমির উর্বরতা কিন্তু কখনই আমাদের বিমুখ করে না। আজকালতো শহুরে মানুষেরা তাদের ছাদেও সবজির বাগান করছে। এই যে মানুষের চেষ্টা ও আন্তরিকতা এই বিষয়টা কিন্তু উন্নত দেশের মানুষের জানা নেই।
আর এই একটি কারণেই আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে কোনো কিছু ভাগ করে খাবার মানসিকতা গড়ে ওঠেনি। সবকিছু গোটা কিনে খাবার মনস্তাত্ত্বিক দিকটিকে অস্বীকারের উপায় নেই। কিন্তু সবদিন কি একভাবে যাবে? যাবে না। এই যে বৈশ্বিক সংকট সেখান থেকে উত্তরণের জাতীয় পরিকল্পনাটুকু না হয় সরকারের দায়িত্ব, কিন্তু সবার জন্য ব্যক্তিপর্যায়ের খাদ্য নিরাপত্তা দেয়ার মতো সক্ষমতা কি আমাদের সরকার বা রাষ্ট্রের এখনও তৈরি হয়েছে? তারপরেও বাংলাদেশের অর্থনীতির এই দুর্বার গতি আমাদের সবার মধ্যে একধরনের চাহিদাতো তৈরি করেছেই। আর সেই জায়গা থেকেই টুকরা করে মাছ বা মাংস বিক্রির বিষয়টিকে আমরা মানতে পারছি না। ধরেই নিচ্ছি দেশে দুর্ভিক্ষ শুরু হয়ে গেছে। বিষয়টি আসলে দুর্ভিক্ষের নয়। বিষয়টি সংকটের। সংকট আসছে বা এসেছে সেটিকে যেমন সরকার লুকাচ্ছে না, ঠিক তেমনি নাগরিক হিসেবে আমাদেরকেও বাস্তব অবস্থাকে মাথায় রাখতে হবে। আর সেটি করতে হবে নিজেদের রক্ষাকবচ হিসেবেই।
পুষ্টি সুশাসন বা Nutrition Governance গোটা বিশ্বেই পরিচিত একটি বিষয়। পুষ্টি সুশাসনের সাথে জাতীয় পুষ্টি ব্যবস্থাপনা নীতি ও কর্ম কৌশল সরাসরি যুক্ত। জাতিসংঘের একটি স্কোরিং সিস্টেম আছে, যার কিছু ইন্ডিকেটর নির্ধারিত আছে কোনো একটি দেশের পুষ্টিমানের হার নির্ধারণের জন্য। সেই স্কোরের ভিত্তিতে তারা লো, মিডিয়াম বা হাই এমন তিনটি ভাগে ভাগ করে প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে। বাংলাদেশ বর্তমানে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে নথিভুক্ত একটি দেশ, যার লক্ষ্য ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের তালিকায় নিজের নাম লেখানো। আর উন্নত দেশের পথে হাঁটতে গেলে সব জনগণের জন্য সুষম খাদ্য ও পুষ্টি ব্যবস্থাপনা একটি বড় ইস্যু। উন্নয়নের রাস্তাকে স্থায়ী করতে গেলেও প্রয়োজন একটি সুন্দর ও সুউল্লেখিত পুষ্টি নীতি।
বাংলাদেশে একটি খাদ্য ও পুষ্টি নীতিমালার খসড়া তৈরি করা হয়েছে। সেই নীতিমালায় আদর্শ, লক্ষ্য, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ও কৌশল থেকে শুরু করে সব প্রকার দিক অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অনলাইনে প্রাপ্ত সেই খসড়া পড়লে বুঝা যাবে বর্তমান সরকার অর্থনৈক উন্নয়নের সমবণ্টনের নিশ্চয়তা কতটা করতে পারবে জানি না কিন্তু চেষ্টা করে যাচ্ছে। যে বৈশ্বিক সংকট এসেছে সেখানে কমদামে খাবার সরবরাহের প্রতিশ্রুতি যদি কেউ দিতেও চায় সত্য হচ্ছে পারবে না।
ডলার সংকট, কাঁচামালের সংকট, দুর্নীতি, সিন্ডিকেট, অতি মুনাফাখোরদের কারসাজি ইত্যাদি মিলে বাজার ব্যবস্থাপনাকে অস্থির করে রাখছে সবসময়। আর তাই টুকরা করে মাছ মাংস বিক্রি বিষয়টাকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় আনা উচিত। শুনেছি এককালে বাজারে এই বিষয়টি প্রচলিত ছিল। কালের পরিক্রমায় আর্থিক উন্নতির সাথে সাথে বিষয়টা হারিয়ে গেছে। পাশের দেশ ভারতের এই বিষয় নিয়ে আমরা প্রচুর হাসাহাসি করতাম। কিন্তু এই যে সামর্থের কথাটি বিবেচনায় রেখে বাজার ব্যবস্থাপনা এটি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী কৌশল। যার সামর্থ আছে সে আস্ত খাবে আবার যার সামর্থ কম সে তার পারিবারিক চাহিদা অনুযায়ী পণ্য কিনবে এটাতে খারাপের কিছু নেই।
প্রয়োজন মতো পণ্য কিনতে পারার সুযোগ উন্নত দেশের কোথাও কোথাও প্রচলিত আছে বলেও শুনেছি। যে পরিবারটি আগে মাসে একবার হয়তো কোনোরকমে একটি মুরগি বা এক কেজি গরুর মাংস কিনে খেতো, দাম বৃদ্ধির কারণে হয়তো তারা সেটিও আর পারছে না। সেখানে যদি স্বল্প পরিমাণে গরুর মাংস/খাসির মাংস বা টুকরা করে মুরগিসহ স্বল্প পরিমাণে সব পণ্য বিক্রির চর্চাটা ব্যাপক হারে প্রচলন হয় স্বল্প আয়ের মানুষেরাও সাহস করবে কিনতে। অনেকের বাসায় হয়তো ফ্রিজিংয়ের ব্যবস্থাও নেই। তারাও দিনের পণ্য দিনেই কিনে খেতে পারবে। সংরক্ষণের অভাবে আর পিছাতে হবে না।
ব্যক্তি পর্যায়ে শুরু হওয়া এই বিষয়টিকে অবিলম্বে সরকারের উচ্চস্তর থেকে উৎসাহ দেয়ার ব্যবস্থা করা উচিত। প্রয়োজনে টিসিবির মাধ্যমে শুরু করতে হবে। স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য পুষ্টি সরবরাহের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানানোর জন্য ব্যাপক প্রচারণার মাধ্যমে সচেতনতার কাজটিও জরুরি। মানুষকে বুঝাতে হবে অল্প কেনায় লজ্জা নেই বরং প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিনে খাদ্য নষ্ট করা একজন সুনাগরিকের কাজ হতে পারে না। আমি নিশ্চিত করেই বলতে পারি এটি সরকারের পুষ্টি ও খাদ্য নীতিকে অনেকদূর এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।
লেখক: কলামিস্ট
]]>