একজন ভিয়েতনামির চোখে বাংলাদেশের মানুষের অতিথিপরায়ণতা


December 27, 2022 at 06:09AM
from somoynews.tv | RSS Feed

বাংলাদেশের মানুষ বিশ্বের সবচেয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ ও অতিথিপরায়ণ। এ কথা চিরন্তন সত্য। এবার সে কথাই শোনা গেল বাংলাদেশে বেড়াতে আসা থান হা নামে এক ভিয়েতনামি নাগরিকের মুখ থেকে। ভিয়েতনামের সংবাদমাধ্যম ভিয়েতনাম নিউজে প্রকাশিত এক নিবন্ধে নিজের বাংলাদেশ সফরের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন তিনি।

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার ব্যাপারে আমার প্রথম অভিজ্ঞতাটা হলো শহরটি প্রচণ্ডভাবে দূষিত। শহরটিতে সর্বত্র ভবন, সেতু ও রাস্তার মতো অবকাঠামো নির্মাণ চলছে। ঢাকার আরেক জটিল সমস্যা হলো যানজট। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পুরো শহরজুড়ে যানজট লেগেই থাকে।

প্রায় দুই কোটি ২০ লাখ জনসংখ্যার এই শহরটি বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর একটি। তবে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে গেল যখন আমি আবিষ্কার করলাম যে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো দেশটির মানুষ!

বন্ধুত্বপূর্ণ ও অতিথিপরায়ণ

আমার ছয় দিনের সফরের পর আমি এই কথা নিশ্চিত করে বলতে পারি যে, বাংলাদেশ একটা চমৎকার অতিথিপরায়ণ দেশ। এখানকার ধনী-দরিদ্র সকলেই বিদেশিদের প্রতি অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ ও অতিথিপরায়ণ আচরণ করে। দেশটির মানুষ বিদেশি অতিথিদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে, বাড়িতে আমন্ত্রণ জানাতে এবং তাদের সুস্বাদু এবং ঐতিহ্যবাহী খাবার খাওয়াতে পছন্দ করে।

একজন নারী ফুটপাতে সকালের নাস্তা বিক্রি করছিলেন। তিনি আমাকে দেখে ইশারায় তার সঙ্গে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করলেন। আমি ভিয়েতনাম থেকে এসেছি শুনে তিনি খুব খুশি হলেন। তিনি জানালেন, ভিয়েতনাম তার খুব পছন্দের দেশ। ভিয়েতনামের জনগণ দেশ রক্ষায় অত্যন্ত সাহসী। অনেকটা বাংলাদেশের জনগণের মতো।

আবদুর রাজ্জাক নামে একজন যুবক এসে আমাকে দুই টুকরো সবজির ডাম্পলিং দিলেন। রাজ্জাক বললেন, ‘আপনি আমার দেশের মেহমান। আপনাকে সকালের নাস্তা কিনে দিতে পেরে আমার ভালো লাগছে। নেন, আমাদের সুস্বাদু খাবারটি আপনার ভালো লাগবে।’

হাসপাতালের কর্মী রাজ্জাক বলেন, আমার হাতে সময় থাকলে বাংলাদেশের বিভিন্ন ধরনের খাবার সম্পর্কে আরও পরিচয় করিয়ে দিতে পারলে আমি আনন্দ পেতাম। পরের দিন একটি ছোট রেস্তোরাঁর মালিক একইভাবে বিদেশি পর্যটক হওয়ায় আমার সঙ্গে কথা বলার পর বিনামূল্যে নাস্তা করাতে চেয়েছিলেন।

সন্ধ্যায় হাঁটার সময় একজন ব্যক্তি স্বেচ্ছায় শহরে ভ্রমণের জন্য আমার গাইড হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। ওই ব্যক্তির ভিয়েতনাম সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা ছিল। বাংলাদেশ সম্পর্কে আমরা সব প্রশ্নের উত্তর তিনি দিয়েছেন। একই সঙ্গে ভিয়েতনাম সম্পর্কেও তার কিছু প্রশ্নের উত্তর আমি দিয়েছি।

শহরের আরেক বাসিন্দা রশিদ ইসলাম। তবে তিনি আমাকে দেখে কিছু জিজ্ঞাসা করেননি। তাকে দরিদ্র ও অভাবী মনে হয়েছিল। যখন আমি তাকে আমার জুতা উপহার দিলাম তখন তিনি শুধু 'ধন্যবাদ' দিয়ে যাচ্ছেন। রশিদ বলেন, এটি তার স্ত্রীর জন্য একটি চমৎকার উপহার হবে।

শুধু রাজধানীতেই নয়, বাংলাদেশের যেখানেই যান বিদেশি দর্শনার্থীরা আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন। তারা শুধু 'হ্যালো' এবং কয়েকটি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার চেয়ে আরও বেশি কিছু জানতে চায়।

সবাই জানতে চায় আপনি কোথায় থেকে এসেছেন, কোথায় যাচ্ছেন, কে আপনাকে তাদের দেশে নিয়ে এসেছে এবং বাংলাদেশ সম্পর্কে আপনি কী ভাবছেন। তারা খুব হাসিমুখে ছবি তোলা পছন্দ করে। আপনি ফটোগ্রাফি হলে তাদের সঙ্গে আপনার খুব চমৎকার সময় কাটবে।

আরও পড়ুন: সুবর্ণজয়ন্তী পেরোনো বাংলাদেশের অর্জন অভূতপূর্ব: মুনতাসীর মামুন

ফুটবলভক্ত জাতি

বাংলাদেশ সম্পর্কে আমি শুধু জানতাম তারা ক্রিকেটপ্রিয় জাতি এবং তাদের বিশ্বমানের একটি ক্রিকেট দল আছে। স্থানীয় টিভি স্পোর্টস চ্যানেলে সঙ্গে কথা বলে আমি জানতে পেরেছি, বাংলাদেশিরা এই ব্যাট-বল খেলার সত্যিই বিশাল ভক্ত।

তবে ফুটবলের প্রতি বাংলাদেশিদের ভালোবাসা আমাকে অবাক করেছে। বিশেষ করে ২০২২ কাতার ফুটবল বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন দল আর্জেন্টিনা এবং তাদের অধিনায়ক লিওনেল মেসির প্রতি তাদের সমর্থন আমি অবাক হয়েছি।

বিশ্বকাপের সময় অনেক বাড়ির ছাদে আর্জেন্টিনার পতাকা উড়ছে। অনেক ভবন পতাকার রং দিয়ে আঁকা হয়েছে। খেলোয়াড়দের অসংখ্য প্রতিকৃতি দেশজুড়ে শহরগুলোতে সাজানো হয়েছে।

বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচ আমি কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে একটি বিশাল প্রজেক্টরে দেখেছি। যেখানে কয়েক হাজার লোক একসঙ্গে খেলা দেখেছে। সেখানকার প্রায় সবাই আর্জেন্টিনার সমর্থক ছিলেন।

আর্জেন্টিনা গোল দেয়ার পর ভক্তরা লাফিয়ে, হাততালি ও জোরে চিৎকার করে উল্লাস শুরু করে। টাইব্রেকারের সময় আর্জেন্টিনার গোলকিপার এমিলিয়ানো মার্টিনেজ যাতে ফ্রান্সের গোল ঠেকিয়ে দেয় সেজন্য তারা প্রার্থনাও করে।

শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা যখন টাইব্রেকারে ফ্রান্সকে ৪-২ ব্যবধানে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়, তখন সমর্থকরা বাঁধভাঙা উদযাপনে ফেটে পড়ে।তখন পুরো কক্সবাজার শহরের লোকজন আর্জেন্টিনার আকাশী নীল এবং সাদা জার্সি পরে রাস্তায় নেমে আসে।

আর পড়ুন:ভ্রমণপিপাসুদের অবশ্যই যা মনে রাখতে হবে

আর্জেন্টিনার প্রতি বাংলাদেশি সমর্থকদের ভালোবাসার অন্যতম কারণ ১৯৮৬ সালে বিশ্বকাপের দেশটি চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। সেই বিশ্বকাপে দিয়েগো ম্যারাডোনার ঐতিহাসিক পারফরম্যান্সে আর্জেন্টিনা টুর্নামেন্ট জিতে। মূলত ম্যারাডোনার প্রতি ভালোবাসা থেকেই বাংলাদেশের মানুষ আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করে আসছে।

সেই বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নেমেছিল ডিয়াগো ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা। সেই ম্যাচে ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক পিটার শিল্টনকে বোকা বানিয়ে হাত দিয়ে গোল দেন ম্যারাডোনা। যা 'হ্যান্ড অব গড' গোল নামে পরিচিত।

তবে বর্তমানে ম্যারাডোনার চেয়েও মেসির জনপ্রিয়তা দেশটিতে বেশি। ২০১১ সালে একটি প্রীতি ম্যাচ খেলতে মেসি বাংলাদেশে আসার পর দেশটির প্রতি সমর্থন নতুন মাত্রা যোগ করে।

ফাইনালে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর উদযাপনে যোগ দেয়া একজন আর্জেন্টাইন সমর্থক আমাকে বলেন, ‘আমরা মেসিকে ভালোবাসি, আমরা আর্জেন্টিনাকে ভালোবাসি। আমরা চিরকাল তাদের সমর্থন করে যাব, তাদের সুখ ও দুঃখ ভাগ করে নেব।’

বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার জয় উদযাপনের ছবি ভাইরাল হওয়ার পর আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের টুইটারে বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানিয়ে লিখা হয়, ‘ধন্যবাদ বাংলাদেশ। ধন্যবাদ কেরালা, ভারত ও পাকিস্তান। আপনাদের সমর্থন দুর্দান্ত ছিল।’

]]>
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url