বাংলাদেশের উন্নয়নে কেন তাদের অস্বস্তি?


December 30, 2022 at 05:34AM
from somoynews.tv | RSS Feed

সরকার যাই করুক তার ভেতর থেকে নেতিবাচক কিছু খুঁজে বের করা একটি মহলের অপপ্রয়াসের বড় মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে সরকার কিংবা রাজনৈতিক দলের যতটা-না ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, তার থেকেও বেশি ক্ষতি হচ্ছে দেশবাসীর মানসিকতার।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক প্রপাগান্ডা হচ্ছে এমন একধরনের তথ্যের সরবরাহ, যা কোনো দল কিংবা গোষ্ঠী সম্পর্কিত একপাক্ষিক খবর ছড়িয়ে দেয়া। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এসব খবর হয় মিথ্যা। বেশ কয়েক বছর ধরে এমনটাই দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশে। হোক পদ্মা সেতু বা মেট্রোরেল–সরকার যে মেগা প্রজেক্টেই হাত দিক না কেন, তার মধ্যেই দোষ খুঁজতে ব্যস্ত দেশের নির্দিষ্ট কিছু মহল। কীভাবে সমস্যার সমাধান পাওয়া যায়, তা নিয়ে কথা না বলে ইনিয়ে-বিনিয়ে কীভাবে সমালোচনা করতে হবে–এদিকেই বেশি খেয়াল তাদের।

আরও পড়ুন: মেট্রোরেল: মরিয়ম একা নন, আছেন আরও চার নারী

সারা বিশ্ব যখন মূল্যস্ফীতির জ্বরে কাঁপছে, তখনই দেশের কয়েকটি গণমাধ্যমে কয়েকটি মহল দেশে দুর্ভিক্ষ হবে, না খেয়ে মানুষ মারা যাবে–এ ধরনের তথ্য ছড়াতে ছিল বদ্ধপরিকর। একইভাবে করোনাকালে তারাই বলে বেড়িয়েছেন: বাংলাদেশের যে স্বাস্থ্যব্যবস্থা তাতে রাস্তায় মানুষের গাদা গাদা লাশ পড়ে থাকবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, করোনাকালে বিশ্বের বড় বড় দেশ যখন সমস্যা সামলাতে হিমশিম খেয়েছে, তাদের তুলনায় বাংলাদেশের পরিস্থিতি ছিল অনেকটাই সন্তোষজনক।

একইভাবে এবারের মূল্যস্ফীতিতে যেখানে যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশ বিগত চার দশকের রেকর্ড ভেঙেছে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে মানুষ রাস্তায় নেমেছে; সেখানে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি বাড়লেও তা এখন পর্যন্ত সহনশীলতার মধ্যেই আছে বলে জানান দেশের অর্থনীতিবিদরা।


পদ্মা সেতুর কাজ শুরুর আগ থেকেই একটি মহল বলে আসছিল, পদ্মা সেতু বানালে দেশ দেউলিয়া হয়ে যাবে। এদের মধ্যেই অনেকে বলেছেন প্রমত্তা পদ্মার ওপর সেতু বানানোই সম্ভব নয়। তাদের কাছে পদ্মা সেতুর উদ্বোধন ছিল বড় রকমের একটি চপেটাঘাত। যেখানে বিশ্বব্যাংক থেকে শুরু করে প্রায় প্রতিটি বাঘা বাঘা দেশের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের অগ্রগতির প্রশংসায় পঞ্চমুখ, সেখানে এ দেশেরই একদল মানুষ দিনরাত শুধু সমালোচনাই করে যাচ্ছেন। কদিন আগেও যারা বলেছেন, পদ্মা সেতুর মতো প্রজেক্ট বাংলাদেশে সম্ভব নয়, এবার তারা শব্দ বদলে এক সুরে বলছেন, সেতুর ওপর দিয়ে রেললাইন বসালে যে খরচ হবে, তা বহন করতে গেলে দেশের টাকায় টান পড়বে।

আরও পড়ুন: মেট্রোরেলে উঠেই যাত্রীদের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস (ভিডিও)
 

এই মহলের মানুষরাই কয়েক বছর আগে বলেছিলেন, ঢাকা শহরে মেট্রোরেল একটা অতি-উৎসাহী খরুচে প্রকল্প। অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করে বলেছিলেন, মেট্রোরেল চলতি বছর আদৌ চালু হবে না। কিন্তু পদ্মা সেতুর মতো মেগা প্রজেক্টের পর একই বছর মেট্রোরেলের উদ্বোধন তাদের কাছে আরেকটি বড় রকমের চপেটাঘাত। এই মহলের মানুষ ও তাদের এজেন্ট মিডিয়ার কথাবার্তা শুনলে মনে হবে, বাংলাদেশে ভালো কিছু হওয়াই সম্ভব নয়। অনেকের কথার সারমর্ম হচ্ছে: বৈশ্বিক সংকটে আমাদের সব টাকা জমিয়ে রাখা উচিত, কোনো ধরনের মেগা প্রজেক্টে আর টাকা ব্যয় করা উচিত নয়। শ্রীলঙ্কার সঙ্গে তুলনা করে অনেকেই বলছেন, মেগা প্রজেক্টে হাত দিলেই দেশ দেউলিয়া হয়ে যাবে।

বাংলাদেশ অযথা খরুচে প্রজেক্টে টাকা ঢালছে কি না–এমন প্রশ্নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক রুমানা হক সময় সংবাদকে বলেন, ‘যারা বলছেন পদ্মা সেতু কিংবা মেট্রোরেলের দরকার নেই, তাদের কাছে একটি প্রশ্ন: এ দুটি প্রজেক্টের বিকল্প দেখান। পদ্মা সেতু হওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের যে সুবিধা হয়েছে এবং অর্থনৈতিকভাবে দেশের দক্ষিণাঞ্চল থেকে শুরু করে পুরো দেশের যে লাভ হবে তাতে করে কয়েক বছরের মধ্যেই খরচ উঠে যাবে। বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কার মতো কোনো অদূরদর্শী ও অপ্রয়জনীয় মেগা প্রজেক্টে টাকা ঢালছে বলে আমার মনে হয় না।’

‘একইভাবে মেট্রোরেলের বিকল্পও কিন্তু আমাদের ছিল না। ঢাকা যখন যানজটে এক রকমের স্থবির হয়ে পড়েছে, কোনো কিছুতেই কিছু হচ্ছিল না, তখন ঢাকা শহরের যানজট কমাতে মেট্রোরেলের কোনো বিকল্প আমি দেখি না। অন্যদিকে এটি এমন একটি বাহন যা আমাদের কর্মঘণ্টা বাঁচিয়ে আর্থিকভাবে লাভবান করবে। মেট্রোরেলে যা খরচ হয়েছে তা কয়েকগুণ হয়ে লাভের আকারে ফিরে আসবে,’ যোগ করেন রুমানা হক।

আরও পড়ুন:  মেট্রোরেলে চড়ে গান গাইলেন প্রধানমন্ত্রী
 

প্রজেক্টের সিদ্ধান্ত বাদে সমালোচনাকারী মহলের আরেকটি অভিযোগ ইচ্ছাকৃত সময় বাড়িয়ে প্রজেক্টের খরচ বাড়ানো হয়। কিন্তু এটি কোনো প্রকল্পের দোষ হতে পারে না, কিংবা প্রকল্প বন্ধ রাখার কারণ হতে পারে না। বলা বাহুল্য উপমহাদেশের আমলাতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে এ ধরনের জটিলতা একটি মৌলিক সমস্যা। এখানে অনেক ক্ষেত্রে সরকারকেও বড় রকমের ভোগান্তির শিকার হতে হয়। তবে দেখা গেছে, বরাবরই প্রধানমন্ত্রী প্রজেক্টের কাজের দীর্ঘসূত্রিতার কড়া সমালোচনা করে আসছেন। এমনকি যারা এ ধরনের কাজ করে পরবর্তীতে তারা যাতে কাজ না পায় সেদিকেও লক্ষ্য রাখছেন সরকারপ্রধান।

এ ব্যাপারে রুমানা হক বলেন, ‘ব্যবস্থাপনায় কিছু সমস্যা আছে এটা অস্বীকার করার কিছু নেই। তবে এটি সমাধানযোগ্য। বিশেষ করে যেসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করা হয় সেখানে সরকারে আরও কৌশলী হতে হবে। বিশেষ করে সময় বাড়ালে নির্দিষ্ট মেয়াদে প্রতিষ্ঠানকেই প্রজেক্টের বর্ধিত সময়ের একটি অর্থ বহন করতে হবে- এমন নীতিনির্ধারণের মধ্য দিয়ে কাজ করতে হবে। এ ছাড়া যেসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজ ভালো না কিংবা সময়মতো কাজ করে না তাদের ভবিষ্যতে কাজ দেয়া যাবে না। সরকারি পর্যায়ে জবাবদিহিতা বাড়বে জোর দিলে ও সরকার কৌশলী আচারণ করলে এসব সমস্যা অনেকটাই কমে আসবে।’

এবার প্রশ্ন হচ্ছে যারা বারবার দোষ খুঁজে যাচ্ছেন, বাংলাদেশের কোনো উন্নতি হবে না বলে অপপ্রয়াস চালাচ্ছেন, তাদের আসলে লাভটা কোথায়? তারা কী হতাশ, নাকি আছে বড় কোনো দূরভিসন্ধি? কেনইবা তাদের নেতিবাচক কথাগুলোকে ফলাও করে প্রচার করা হয় নির্দিষ্ট কিছু গণমাধ্যমে? এসব প্রশ্নের উত্তর এক কথায় দেয়া সম্ভব না হলেও তাদের পরিচয় ও পদবি থেকে তাদের উদ্দেশ্য ও শঙ্কার কারণ অনেকটাই বোঝা যায়। বিশেষ করে তথাকথিত যেসব সুশীল ব্যক্তি ও তাদের প্রতিষ্ঠান বিদেশি অনুদানের ওপর নির্ভরশীল- তাদের বড় একটি ভয় বাংলাদেশের ২০২৬ সালে এলডিসি গ্রাজুয়েশন হলে পাওয়া যাবে না আর কোনো বিদেশি সাহায্য ও অনুদান। ডলার বেতন পেয়ে স্বপ্নের জীবন কাটানোর দিনগুলো অতীত হয়ে যাবে তাদের। যারা এতদিন বাংলাদেশের দুর্দশা বেচে নিজেদের পকেট ভারী করেছে, বিদেশি সাহায্য নিয়ে নিজেদের গাড়ি-বাড়ি করেছেন, তাদের কাছে উন্নত বাংলাদেশ একটি দুঃস্বপ্নের নাম হবে- এটাই কী স্বাভাবিক না?

বাংলাদেশ ঠিকভাবে মেগা প্রজেক্টের কাজগুলো করতে পারে এর প্রমাণ বিমানবন্দরে চলমান থার্ড টার্মিনালের কাজ। এ কথা উল্লেখ করে রুমানা হক বলেন, ‘ওখানে তো এমন কোনো আলাদা জাদুর কাঠি নেই যে অন্যসব প্রজেক্টের থেকে ভালোভাবে কাজ হচ্ছে। এটাও আমাদের দেশই করছে। নিজেদের উদাহরণ নিজেদের দিয়েই দিতে পারছি আমরা। আমাদের দেশের গণমাধ্যমগুলোর গৎবাঁধা দোষ না বলে ভালো উদহারণগুলোকে সামনে এনে, সেগুলোর কার্যপ্রণালি বিশ্লেষণ করে দেখানো উচিত আমরা পারি, আমাদেরও সক্ষমতা আছে।’

আরও পড়ুন: সর্বোচ্চ ১০ বছর জেল ও ১০ কোটি টাকা জরিমানা

কবি আবুল হাসানের ভাষায়, ‘রাজা যায় রাজা আসে।’ কিন্তু বঙ্গবন্ধু যেমনি স্বাধীনতার নায়ক হিসেবে বাঙালির মনে আজীবন ভাস্বর হয়ে থাকবেন, তেমনি আধুনিক বাংলাদেশের নির্মাতা হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামও বাঙালি আজীবন মনে রাখবে উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘পদ্মা সেতু ও মেট্রোরেলের মতো প্রজেক্টগুলো প্রধানমন্ত্রীর সাহস ও দূরদর্শিতার প্রতীক। আমরা যেমনি স্বাধীনতার নায়ক হিসেবে বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি, একইভাবে কয়েক দশক পরে আগামী প্রজন্ম আধুনিক বাংলাদেশের নির্মাতা হিসেবে শেখ হাসিনাকে স্মরণ করবে। ক্ষমতায় অনেকেই আসেন, সামনেও আসবেন। কিন্তু রাষ্ট্রনায়ক সবাই হতে পারেন না। শেখ হাসিনা পারবেন–এটা তার কার্যক্রমই বলে দিচ্ছে।’

পদ্মা সেতু ও মেট্রোরেলের মতো প্রতিটি প্রজেক্টের উদ্বোধনী দিনে সাধারণ জনতার উল্লাস ও আগ্রহই বলে দেয়, দেশবাসীর কাছে কতটা প্রাণের দাবি ছিল এসব প্রজেক্ট। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায়ই তার বক্তব্যে বলে থাকেন, ‘যে গাছ ফল দেয়, মানুষ সেখানেই ঢিলটা মারে।’ ঢিল খেয়েও দেশের জন্য সাহসিকতার সঙ্গে, দূরদর্শী সব কাজ করে যাচ্ছে বর্তমান সরকার; যা বাংলাদেশকে নিয়ে যাবে অনন্য উচ্চতায়- এমনটাই মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

]]>
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url