মাহাথির মোহাম্মদ: হার না মানা এক রাজনীতিকের গল্প


October 15, 2022 at 06:01AM
from somoynews.tv | RSS Feed

আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার বলা হয় তাকে। একটা উন্নয়নশীল দেশকে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর কাতারে শামিল করেছেন তিনি। তাকে মালয়েশিয়ার রাজনীতির এক অতন্দ্র প্রহরী বললেও অত্যুক্তি হয় না। প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে রাজনীতির ময়দানে প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন। তিনি আর কেউ নন, মাহাথির মোহাম্মদ। যিনি দেশ ও জাতির পাশাপাশি নিজেকেও এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। যে কারণে দেশে-বিদেশে এখনও সমান জনপ্রিয় তিনি। তাকে ঘিরে যেন মানুষের আগ্রহের শেষ নেই।

অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ উল্লেখযোগ্য দেশগুলোর অন্যতম মালয়েশিয়া। গত কয়েক বছর ধরেই দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গন বেশ উত্তপ্ত। ক্ষমতার দখল আর প্রভাব বিস্তারের খেলা চলছে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে। যেখানে মূল খেলোয়াড় হিসেবে প্রায়ই বিশ্ব গণমাধ্যমে উঠে আসে মাহাথির মোহাম্মদের নাম।

চলতি সপ্তাহে আরও একবার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নজর কাড়েন মাহাথির। গণমাধ্যমগুলো অনেকটা বিস্ময়ের সঙ্গে জানায়, আবারও মালয়েশিয়ার সাধারণ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে যাচ্ছেন মাহাথির মোহাম্মদ। সাংবাদিকদের এ বিস্ময়ের কারণটাও স্পষ্ট। আর সেটা হচ্ছে, তার বয়স। এ মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে প্রবীণ রাজনীতিক মাহাথিরের বয়স এখন তিন বছর কম ১০০।

যে বয়সে মানুষ অবসরে গিয়ে একটু আরাম-আয়েশে সময় কাটানোর কথা ভাবে, সেই বয়সে নিজ দেশ ও জাতির জন্য  আরও একবার ঘুরে দাঁড়াতে চাইছেন লড়াকু এ নেতা। যে বয়সে লোকে হাটার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলে, ঠিক সেই বয়সে বুক সটান করে আরও একবার দৃপ্ত পায়ে দৌঁড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি।

নতুন লড়াইয়ের ঘোষণা 

গত ১০ অক্টোবর মালয়েশিয়ার পার্লামেন্ট ভেঙে দেয়া হয়। সংসদ ভেঙে দিয়ে আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেন দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ইসমাইল সাবরি ইয়াকুব। ক্ষমতাসীন জোট ইউনাইটেড মালয়াস ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনের (ইউএমএনও) মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের মধ্যে এ সিদ্ধান্ত নেন তিনি। জোটের আশা, আগামী নির্বাচনে তারাই বড় জয় নিয়ে ক্ষমতায় ফিরবে।

মালয়েশিয়ায় নির্বাচিত সরকারের মেয়াদ পাঁচ বছর। সেই হিসেবে আগামী বছরের সেপ্টেম্বরে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পার্লামেন্ট ভেঙে দেয়ায় এখন দেশটিতে আগাম নির্বাচন হবে। দেশটির সংবিধান অনুযায়ী, পার্লামেন্ট বিলুপ্তির ৬০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। খুব শিগগিরই আগামী নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন।

আরও পড়ুন: জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা মাহাথির মোহাম্মদের

পার্লামেন্ট ভেঙে দেয়ার একদিন পরই তথা মঙ্গলবার (১১ অক্টোবর) এক ঘোষণায় মাহাথির জানান, আগামী জাতীয় নির্বাচনে একটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন তিনি। তবে নির্বাচনে মাহাথিরের জোট জিতলেও তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হবেন কিনা তা জানাননি তিনি। সেদিন এক সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কে প্রধানমন্ত্রী হবেন সে ব্যাপারে আমরা এখনও সিদ্ধান্ত নিইনি। কারণ আমরা যদি নির্বাচনে জয়ী হই, তখনই কেবল প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বিষয়টি আসবে।’ তবে জিতলে তিনিই প্রধানমন্ত্রী হবেন, এমনটাই মনে করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার সবচেয়ে প্রবীণ প্রধানমন্ত্রী হবেন তিনি।

মাহাথিরের লড়াইয়ের ঘোষণা নিয়ে বিস্ময়

এখন পর্যন্ত মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দুইবার দায়িত্ব পালন করেছেন মাহাথির। প্রথমবার ১৯৮১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত টানা ২২ বছর। আর দ্বিতীয়বার ২০১৮ সাল থেকে ২০২০ সাল। দ্বিতীয় তিনি যখন প্রধানমন্ত্রী তখন তার বয়স ছিলো ৯৩ বছর। নতুন করে আবারও নির্বাচনে লড়াইয়ের আগ্রহ প্রকাশ করলেন। তবে এবার তার ভক্ত, সমালোচক ও পর্যবেক্ষকদের বিস্ময়ের ঘোর যেন কাটছেই না। যার প্রধান কারণ তার বয়স ও স্বাস্থ্য।

ইদানিং মোটেই ভাল যাচ্ছে না মাহাথিরের স্বাস্থ্য। মাহাথিরের হৃদ্‌রোগের ইতিহাস রয়েছে। একবার বাইপাস সার্জারি হয়েছিল তার। গত বছরের ডিসেম্বরেই মাহাথির এক দফা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। কয়েকদিন পর তাকে ছাড়পত্র দেয়া হয়। এরপর চলতি বছরের জানুয়ারির শুরুর দিকে আবারও হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। এ দফায় তিনি ছয় দিন হাসপাতালে ছিলেন। এরপর গত ২২ জানুয়ারি মাহাথিরকে আরেক দফায় হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে তিনি হাসপাতাল ছাড়েন।

এরপর সাত মাস পর আগস্টের শেষ দিকে করোনায় আক্রান্ত হয়ে ফের হাসপাতালে ভর্তি হন মাহাথির। হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পান সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম দিকে। তবে আগাম নির্বাচনের ঘোষণার পর মাহাথির এখন বলছেন, নির্বাচনে লড়াই করার মতো ‘যথেষ্ট শারীরিক সক্ষমতা’ রয়েছে তার। এই বয়সেও তার এ প্রবল মানসিক শক্তিই সবাইকে বিস্ময়ে হতবাক করছে।

যে কারণে আবারও ফিরে আসা মাহাথিরের

বর্তমানে মাহাথিরের যে লড়াই তা মূলত মালয়েশিয়ার রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে। যা গত কয়েক বছরে নিজের কর্মকাণ্ড ও বক্তব্যে বারবার স্পষ্ট করেছেন। শেষ লড়াইটাও সেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে। মঙ্গলবার নির্বাচনে লড়াইয়ের ঘোষণার সময় তা আরও একবার স্পষ্ট করেন তিনি।

তার প্রধান উদ্বেগ তারই রাজনৈতিক শিষ্য সাবেক বিতর্কিত প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক। যিনি বর্তমানে মালয়েশিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্নীতির মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে জেল খাটছেন। এদিন উদ্বেগের পাশাপাশি সতর্ক করে মাহাথির বলেন, ক্ষমতাসীন জোট ইউএমএনও আবারও ক্ষমতায় আসলে জেল থেকে ছাড়া পেতে পারেন নাজিব। আদালত তাকে বেকসুর খালাস ঘোষণা করতে পারেন। বেঁচে থাকতে মাহাথির সেটা হতে দিতে চান না। আর তাই আবারও কোমর বেঁধে নামছেন তিনি।

আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার

মাহাথিরের জন্ম মালয়েশিয়ার কেদাহ প্রদেশের আলোর সেতার অঞ্চলে ১৯২৫ সালে। মালয়েশিয়া তখন ব্রিটিশ শাসনের অধীন এক অনুন্নত দেশ। তার বাবা ছিলেন এক স্কুল শিক্ষক। সাফল্যের সঙ্গে স্কুল-কলেজ শেষ করে সিঙ্গাপুরের ইউনিভার্সিটি অব মালয়ায় চিকিৎসা শাস্ত্রে ভর্তি হন তিনি।

১৯৫৩ সালে পাশ করে বের হওয়ার পরপরই সরকারি মেডিকেল অফিসার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। কিন্তু চার বছর পর ১৯৫৭ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে যোগ দেন। সেই সঙ্গে স্বাধীনভাবে নিজের চিকিৎসা পেশা চালিয়ে যান।

ইউনাইটেড মালয়াস ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনের (ইউএমএনও) টিকেটে ১৯৬৪ সালে প্রথমবারের মতো পার্লামেন্ট সদস্য হন মাহাথির। এরপর রাজনৈতিক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ১৯৮১ সালে দলের তথা ইউএমএনও’র প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তিনি। একই বছর দখলে নেন প্রধানমন্ত্রীর পদও। এরপর ২০০৩ সালে ক্ষমতা থেকে স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত দীর্ঘ ২২ বছর মালয়েশিয়া শাসন করেন তিনি।  

মাহাথিরের দীর্ঘ শাসনকালই মালয়েশিয়াকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সঙ্গে বহুল কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক উন্নতি এনে দিয়েছে। গত শতকের আশির দশক থেকে মালয়েশিয়ার দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও রূপান্তরের জন্য পুরো কৃতিত্ব তার।

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পূর্বে কিছুকাল শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন মাহাথির। এ সময় তিনি দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টির কার্যকরী ও প্রায়োগিক কর্মসূচি গ্রহণ করেন। তিনি উপলব্ধি করেন, জাতীয় উন্নতি ও অগ্রগতির জন্য শিক্ষা অপরিহার্য। সে কারণে জাতিকে পশ্চিমা জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষায় শিক্ষিত করতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দিয়ে শিক্ষা খাতকে সমৃদ্ধ করেন।

তিনি আরও উপলব্ধি করেন, একটি দরিদ্র দেশকে সমৃদ্ধশালী করতে হলে বিনিয়োগ অপরিহার্য। সে কারণে তিনি জাতিকে শিক্ষিত করে প্রস্তুত করেন ও দেশের আইনশৃঙ্খলা, শিক্ষা ব্যবস্থা, রাস্তাঘাট ও সুশাসন নিশ্চিত হওয়ায় বিদেশিরা অতি আগ্রহভরে বিলিয়ন বিলিয়ন বিনিয়োগ করতে শুরু করেন। সেই বিনিয়োগের ওপর ভর করে মালয়েশিয়া পশ্চিমা দুনিয়ার বাজার দখল করে।

এভাবে অতি অল্প সময়ে মাহাথির জনগণের ভাগ্যের অভূতপূর্ব ও অভাবনীয় উন্নয়ন ঘটান। মালয়েশিয়াকে শিল্পসমৃদ্ধ সম্পদশালী ও ধনী দেশে পরিণত করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেন। পৃথিবীর সর্বোচ্চ টুইন টাওয়ার কুয়ালালামপুরে তৈরি করা হয়।

আরও পড়ুন: হিজাব পরা নারীই একদিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী হবেন: ওয়াইসি

ব্যবসা-বাণিজ্যের এমনভাবে প্রসার ঘটান যাতে দেশের মানুষের সবার সমঅধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্যবসা-বাণিজ্য কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর হাতে কুক্ষিগত করার সুযোগ তিরোহিত করে সবার জন্য অবারিত করা হয়। মেধা, যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা বণ্টন করার নীতি মালয়েশিয়াকে এগিয়ে নেয়।

ঘুষ, দুর্নীতি প্রভৃতি কর্মকাণ্ডকে কঠোর হস্তে দমন করে দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল করা হয়। সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ব্যবসা বাণিজ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শ্রমবাজার প্রভৃতি খাতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা মাহাথিরের অনন্য অবদান। এসব ক্ষেত্রে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে গণমানুষের মনে তিনি জায়গা করে নেন। কোটিপতি সৃষ্টিতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাকে নির্বাসনে পাঠিয়ে তিনি মালয়েশিয়াকে সাম্য-স্বাধীনতার মডেলে পরিণত করেন। এক সময়ের ‘গরিব’ মালয়েশিয়া উঠে আসে উন্নত দেশের কাতারে।

দুর্নীতি ও অনিয়মের মচ্ছব দেখে ক্ষেপে যান মাহাথির

মালয়েশিয়াকে উন্নতির শিকরে পৌঁছে দিয়ে ২০০৩ সালে রাজনীতি থেকে অবসরে যান মাহাথির। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে শুরু হয় দুর্বৃত্তায়ন। দেশ ছেয়ে যায় ঘুষ-দুর্নীতিতে। দুর্নীতি, লুটপাট ও অনিয়ম হয়ে ওঠে ‘স্বাভাবিক ব্যাপার’।    

২০০৮ সালে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন মাহাথিরের এক সময়ের রাজনৈতিক শিষ্য নাজিব রাজাক। কিন্তু তার শাসনকালে দুর্নীতি ও লুটপাটের সব রেকর্ড ভেঙে যায়। মালয়েশিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় তহবিল ‘ওয়ান মালয়েশিয়া ডেভেলপমেন্ট বেরহাদ’র (ওয়ানএমডিবি) অর্থ চুরির অভিযোগ ওঠে নাজিবের বিরুদ্ধে।

সব দেখেশুনে ক্ষেপে যান মাহাথির। নিজ দলের দুর্নীতিগ্রস্ত নেতা নাজিব রাজাককে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে হটাতে ও দুর্নীতির শিকড় উচ্ছেদে ২০১৬ সালে ফের রাজনীতিতে নামার ঘোষণা দেন তিনি।

এক সময়ের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে জোট বেধে নির্বাচনে লড়াইয়ে নামেন মাহাথির। ২০১৮ সালের নির্বাচনে মাহাথির-আনোয়ারের জোট পাকাতান হারাপান। ৯৩ বছর বয়সে দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন তিনি। রাষ্ট্রীয় তহবিলের বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে নাজিবের বিরুদ্ধে বিচার শুরু হয়। বিচারে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় নাজিবের ১২ বছর কারাদণ্ড হয়।

ক্ষমতাসীন জোটের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জেরে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে মাহাথির পদত্যাগ করেন। কিন্তু এখানেই থেমে যাননি তিনি। পেজুয়াং পার্টি নামে নতুন দল গঠন করে সমমনা ছোট ছোট দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠন করেন তিনি।

]]>
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url