কুষ্টিয়ায় আমন আবাদ খরচ বেড়ে দ্বিগুণ, শঙ্কায় কৃষক

September 05, 2022 at 06:48AM
from somoynews.tv | RSS Feed
চলতি মৌসুমের শুরুতে চাহিদামত বৃষ্টি না হওয়ায় কুষ্টিয়ায় আমনের আবাদ শুরু হয়েছে দেরিতে। এতে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে দেখা দিয়েছে শঙ্কা। পাশাপাশি জ্বালানি তেল ও সারের দাম বেড়েছে।
দুঃসময়ে দেশের শেষ ভরসা ছিলো কৃষি। করোনার ছোবলে দেশ যখন থমকে ছিলো, তখনও কৃষির চাকা ছিল সচল। নির্ভরতার সেই কৃষি এখন বড় সংকটে। কেননা দেশের প্রায় ৯০ ভাগ জমি চাষ হয় ডিজেল নির্ভর সেচ ব্যবস্থায়। লিটারে ৩৪ টাকা বাড়ায় তাই সেচ নিয়ে চিন্তায় কৃষকরা।
গত বছরের নভেম্বরে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম বৃদ্ধির ধাক্কায় দুর্ভোগে পড়েন কৃষক। এরপর গত সপ্তাহে বাড়ানো হয় সারের দাম। এবার ডিজেল-কেরোসিনের নজিরবিহীন মূল্যবৃদ্ধি মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দেখা দিয়েছে। কৃষকের টিকে থাকাই এখন কঠিন হয়ে পড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
কৃষকেরা বলছেন, সব মিলিয়ে আমন আবাদে খরচ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। তবে কৃষি বিভাগ বলছে, লোকসান পোষাতে কৃষকদের সার্বিক সহযোগিতা করা হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, জেলায় এবার আমনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৮৮ হাজার ৮৯৫ হেক্টর। কিন্তু এ পর্যন্ত অর্জিত হয়েছে ৮৮ হাজার ৫ হেক্টর। একে তো অনাবৃষ্টিতে পানির জন্য কৃষকের হাহাকার তার ওপর ডিজেলের দাম বৃদ্ধিতে বাড়ছে সেচ খরচ। তাই চলতি মৌসুমের ধান আবাদ নিয়ে চিন্তার ভাঁজ কৃষকের কপালে।
কৃষকরা জানান, আমন মৌসুমে তাদের মূল ভরসা বৃষ্টি। কিন্তু ভরা মৌসুমে বৃষ্টি না হওয়ায় ধান লাগাতে বেশ কয়েক দিন দেরি হয়েছে। যার ফলে নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে ধান উঠবে। এর প্রভাব পড়বে ধানের বাজারে।
কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার মশান এলাকার কৃষক আবদুল মান্নান। রোববার (৪ সেপ্টেম্বর) সকালে গিয়ে দেখা যায় তিনি জমিতে ধান লাগাচ্ছেন। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এবার সময় মতো বৃষ্টি হয়নি। বৃষ্টির আসায় থাকতে গিয়ে প্রায় এক মাস ধান আবাদে পিছিয়ে পড়েছি। মাঝে কয়েক দিন বৃষ্টি হয়েছে, সেই কারণে এখন ধান লাগাতে শুরু করেছি। কিন্তু কয়েক দিন পরেই আবার সেচ দেয়া লাগবে। এর মধ্যে যদি বৃষ্টি না হয় তাহলে বিকল্প পথে পানির ব্যবস্থা করতে হবে। আবার শোনা যাচ্ছে, জিকের পাম্প একটা নষ্ট হয়ে গেছে, তাই চিন্তায় আছি।’
জিন্নাহ আলী নামে মিরপুরের সাতমাইল এলাকার আরেক কৃষক বলেন, ‘যেসময় ধানের গোছা মোটা হয়ে যাওয়ার কথা, এবার সেই সময় চারা রোপণ করা হচ্ছে। বৃষ্টির অভাবেই এমনটা হয়েছে। ধানের ভরা মৌসুমেও চাহিদা মতো বৃষ্টির দেখা না মেলায় সেচের জন্য শ্যালোমেশিনের ওপর নির্ভর হতে হচ্ছে। কিন্তু ডিজেলের দাম বৃদ্ধির কারণে সেখানেও কৃষককে অতিরিক্ত টাকা গুনতে হচ্ছে। সঙ্গে বেড়েছে সারের দামসহ কীটনাশক এবং শ্রমিকের দাম। ফলে ধানের উৎপাদন খরচ বেড়েছে কয়েক গুণ। ধানের যা দাম তাতে কৃষকেরা আর পুষিয়ে উঠতে পারছে না। এতে আমন আবাদ চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।’
আরও পড়ুন: ধানের-দাম-কমায়-হতাশ-কৃষক
এদিকে, সারের পর জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। এই দুইয়ের প্রভাবে ফসলের উৎপাদন খরচ যে হারে বাড়বে সে তুলনায় দাম পাবেন কিনা তা নিয়েই শঙ্কায় তার।
বিশেষ করে আমন চাষীরা বলছেন, ডিজেলের দাম বাড়ায় এবার উৎপাদন খরচ বাড়বে মণ প্রতি কমপক্ষে দুইশ’ টাকা। ফলে ধানের দাম বাড়বে অবধারিতভাবে। অন্যদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি কৃষকের ন্যুনতম লাভ নিশ্চিত না করা যায়, তাহলে ধানের উৎপাদন ব্যাহত হবে, প্রভাব ফেলবে গোটা কৃষিখাতেও।
দীর্ঘদিন ধরে ডিজেল সেচ পদ্ধতিতে কুষ্টিয়ায় ধান উৎপাদন করেন মুক্তার হোসেন। বর্ষায়ও বৃষ্টির দেখা নেই তাই ধানি জমি শুকিয়ে চৌচির। ডিজেলের দাম বাড়ায় চারদিন বন্ধ সেচযন্ত্র।
তিনি জানান, ১০ বিঘা জমিতে সেচ দিতে ১৮ লিটার ডিজেল দরকার। এতে একদিনে খরচ বেড়ে গেছে প্রায় ৫৮০ টাকা। সে হিসেবে মৌসুমে ডিজেলেই মোট খরচ বাড়বে ১২ হাজার ২০০ টাকা।
কৃষকরা বলছেন, জমি ভেদে বিঘায় ইউরিয়া সার দরকার ৪০ কেজি। এতে বেড়েছে ২৪০ টাকা। এছাড়া ডিজেল চালিত ধান মাড়াই মেশিনের ৬০০ টাকার জায়গায় দিতে হবে ৮০০ টাকা। এছাড়া কীটনাশক, শ্রমিক, যানবাহনেও খরচ বাড়বে। সব মিলিয়ে মণ প্রতি ধান উৎপাদনে খরচ হবে প্রায় হাজার টাকা। বিদ্যুতের সেচেও সুবিধা করতে পাড়ছে না কৃষক। খরার কারণে সেচ দিতে হচ্ছে দ্বিগুণ। দুই ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের কথা থাকলেও দিনে বিদ্যুৎ যাচ্ছে চার-পাঁচবার।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে প্রতিটি কৃষি উপকরণের দাম আকাশছোঁয়া। উৎপাদন খরচ বাড়লেও পণ্যের ন্যায্য দাম পান না কৃষক। তারা বলছেন, কৃষক না বাঁচলে উৎপাদন ব্যাহত হবে। হুমকিতে পড়বে খাদ্য নিরাপত্তা। ফলে সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কৃষকের স্বার্থে ভর্তুকি বাড়াতেই হবে।
তবে সরকার বলছে, তারা কৃষকের পাশে আছে। বিনামূল্যে বীজসহ নানা উপকরণ দেয়া হচ্ছে। ভর্তুকি বাড়ানো হয়েছে। দাম বৃদ্ধির প্রভাব কৃষক পর্যায়ে পড়বে না।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হায়াত মাহামুদ বলেন, ‘আমন ধান আবাদের মৌসুমে কৃষকেরা মূলত বৃষ্টির ওপরেই অনেকটা নির্ভরশীল থাকেন। তাই অনাবৃষ্টি এবং একই সময় ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধিতে কৃষকদের খরচ কিছুটা বাড়াবে। তবে কৃষকদের লোকসান পোষাতে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শসহ সার্বিক সহযোগিতা করা হচ্ছে।’