যেভাবে তৈরি হলো ‘হাওয়া’র আবহসংগীত


July 27, 2022 at 06:14AM
from somoynews.tv | RSS Feed

সম্প্রতি পুরো দেশজুড়ে আলোচিত বিষয় মেজবাউর রহমান সুমনের পরিচালিত সিনেমা ‘হাওয়া’। গভীর সমুদ্রে চিত্রায়িত রহস্যে ঘেরা এ সিনেমার আলোচনার সূত্রপাত হাশিম মাহমুদের গান ‘সাদা সাদা কালা কালা’ হলেও পরবর্তীকালে সিনেমার ট্রেইলার, পোস্টার ও মেঘদল ব্যান্ডের উৎসর্গ করা প্রমোশনাল গান ‘এ হাওয়া’র মাধ্যমে তা ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। আর এই ছড়িয়ে পড়ার পেছনে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করে, সে সিনেমার গান, শব্দ বা আবহসংগীত। মুক্তির আগেই বিপুল জনপ্রিয়তা পাওয়া এ সিনেমাটির আবহসংগীত যিনি করেছেন তার মুখোমুখি হয়েছে সময় সংবাদ।

যাকে আবহসংগীতের অন্যতম একজন পথিকৃত বলা যায়। দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে যিনি কাজ করছেন সংগীত নিয়ে। জনপ্রিয়তা পাওয়া অসংখ্য কাজে তিনি আবহসংগীতের কাজ করেছেন। নুরুল আলম আতিকের লাল মোরগের ঝুঁটি সিনেমাসহ ওয়েব সিরিজ কাইজার, কন্ট্রাক্ট ঊনলৌকিক, রূপবান ও আরও অনেক জনপ্রিয় কাজের আবহসংগীত করেন তিনি। সম্প্রতি জনপ্রিয়তা পাওয়া ‘হাওয়া’ সিনেমার আবহসংগীতও করেছেন। তিনি দেশের জনপ্রিয় ব্যান্ড মেঘদলের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য, গিটারিস্ট ও কম্পোজার। আবার কখনো কখনো কণ্ঠশিল্পী ও সুরকার হিসেবেও কাজ করেছেন। তিনি আবহসংগীতের অন্যতম এক ব্যক্তিত্ব রাশিদ শরীফ শোয়েব।
 
শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটে আড্ডা থেকে যাত্রা শুরু হয় ব্যান্ড মেঘদলের। ফরাসি কবি শার্ল বোদলেয়ারের কবিতা থেকে নেয়া মেঘদল শব্দটি যা অনুবাদ করেছেন কবি বুদ্ধদেব বসু। সেখান থেকেই এই ব্যান্ডের নামকরণ। সে ব্যান্ডের একজন অন্যতম সদস্য মেজবাউর রহমান সুমন। যিনি ‘হাওয়া’র পরিচালক। কিছুদিন আগে সময় সংবাদ এ পরিচালকের মুখোমুখি হয়। মঙ্গলবার (২৬ জুলাই) সময় সংবাদ কথা বলে, যিনি অনেক আগে থেকেই স্বপ্ন দেখেছেন এ সিনেমার আবহসংগীত করার, সেই আবহসংগীতের স্রষ্টার সঙ্গে।

আরও পড়ুন: হাওয়ার ‘হাওয়া’ হয়ে ওঠার গল্প

নিজ ব্যান্ডের একজন সদস্য ও বন্ধুর প্রথম সিনেমার কাজে আবহসংগীত করা নিয়ে রাশিদ শরীফ শোয়েব বলেন, মেঘদলের শুরু থেকেই সুমনের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব ও কাজ করা। এ পর্যন্ত অনেক কাজ করেছি একসঙ্গে। সুমন যখন ফিকশন বানিয়েছে তখন ওর দুই-একটা কাজ বাদে বেশিরভাগ ফিকশনের মিউজিক-ই আমি করেছি। তবে ওর সিনেমায় এটাই প্রথম কাজ করা। বলতে পারেন এটা ১৮ বছর ধরেই একরকম প্রস্তুতি ছিল। সুমনের প্রথম সিনেমায় আমি মিউজিক করবো, যেটা যৌথ একটা স্বপ্ন দেখার মতো। এবং সেই সিনেমাটাই হলো হাওয়া। 

হাওয়ার গল্প প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হাওয়া হলো পুরনো মিথ বা পৌরাণিক কাহিনী। চাঁদ সওদাগর ও মনসার যে মিথলজি সেই মিথের ওপর নির্ভর করেই হাওয়ার কাহিনী। আসলে পুরনো একটা মিথকে এই সময়ে এসে নতুন চোখে দেখা। 

আবহসংগীত করার ক্ষেত্রে তার ভাবনা কী ছিল এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,  এটা একটা সমুদ্রের গল্প। এবং সমুদ্রের গল্প মানেই দুটো জিনিস সবসময় থাকে। তা হলো, শব্দ ও হাওয়া। সুতরাং আমরা ঢেউ শুনবো, মাঝে মাঝে বাতাস বা হাওয়া অনুভব করবো। যার কারণে আমাদের প্রথম চেষ্টাটাই ছিল এই পুরো গল্পের সঙ্গে শব্দটা মিলেমিশে থাকবে। আমরা এমন মিউজিক করবো যেটা এই অ্যাম্বিয়েন্স, এই সাগরের একটা অংশ হয়ে থাকবে। 

হাওয়ার সাউন্ডট্রেক মূলত তিনটা ইন্সট্রুমেন্টের ওপর বেজ করে করা ভয়েসসহ। এই তিনটা ইন্সট্রুমেন্ট মোটামুটি তিনটা মোটিভের গল্প বলে। ইতোমধ্যে আমরা ট্রেইলারে দুইটা ইন্সট্রুমেন্ট ও একটা ভয়েস শুনেছি। কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পেইনগুলোতেও আমরা ভয়েসটা শুনি, ‘আইয়ো আইয়ো আয়’। এই যে একটা ভয়েস, একটা নারীর ভয়েস, যেটা ছবির গল্প বলার জন্য আমরা মিউজিক হিসেবে ব্যবহার করার জন্য নির্বাচন করি। আর দুইটা ইন্সট্রুমেন্টের মধ্যে বাঁশি এখানে একটা প্রধান ইন্সট্রুমেন্ট। এবং আরেকটা ইন্সট্রুমেন্ট হলো সারিন্দা।

এই ভয়েস নির্বাচন করার ক্ষেত্রে ভাবনা কী ছিল এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা তো সবসময় ঠাকুরমার ঝুলি শুনি। বৃদ্ধ দাদু-নানুর কাছে গল্প শুনি। এটাই এই ভয়েস নির্বাচনের একটা ফর্ম। যেটা আমরা একজন ন্যারেটারের পয়েন্টঅফ ভিউ থেকে দেখতে চেয়েছি। কেউ একজন মিউজিক্যালি ন্যারেট করছে। ওই ভাবনা থেকেই করা। আসলে যারা মনোযোগ দিয়ে ছবিটা দেখবে তারা হয়তো এই ভয়েসের সঙ্গে গল্পের যোগাযোগটা খুঁজে পাবে। শব্দের কানেকশনটা বুঝতে পারবে।

মূল ব্যাপারটা ছিল সংগীতটা আসলে শব্দের সঙ্গে মিলেমিশে থাকবে। হাওয়ার মিউজিক করতে গিয়ে এই ভাবনাটাই কাজ করেছে। আরেকটা বিষয় বললে ব্যাপারটা আরও পরিষ্কার হয়। তা হলো, এই সিনেমার গুলতি যে চরিত্রটা আছে, তার একটা থিম আছে। সেই থিম মিউজিক হিসেবে আমরা এই মিউজিক নির্বাচন করেছি। গুলতি যেমন বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রূপে সিনেমায় আর্বিভূত হয়, তেমনি তার সঙ্গে মিউজিকটাও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে বেজে ওঠে। তবে সুরটা কিন্তু একই থাকে। আর এই সুরটাকেই অমরা গুলতি চরিত্রের থিম মিউজিক বলছি।

যে থিমটা কফিল আহমেদের বিবিধ গান ও আমাদের এই অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী কিছু গীতের সংমিশ্রণে করা। অবশ্য কফিল আহমেদের গানে এমনিতেই গীতের একটা আবহ পাওয়া যায়। গুলতি থিমটা আসলে এই দুইটার সংমিশ্রণ থেকেই তৈরি করা হয়েছে।

আরও পড়ুন: প্রমোশনের হাওয়ায় দুলে উঠল জাবি

‘এ হাওয়া‘র সঙ্গে ‘হাওয়া’ সিনোমার মিউজিকের সম্পর্ক বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘এ হাওয়া’ মেঘদল ব্যান্ডের অ্যালুমিনিয়ামের ডানার পঞ্চম গান। যেটা মূল সিনেমায় থাকছে না। এ গানটা মেঘদলের একজন সদস্য হিসেবে মেঘদল ব্যান্ডের পক্ষ থেকে সুমনের জন্য একটা উপহার বলতে পারেন। যারা সিনেমাটা দেখবেন তারা এমনিতেই বুঝতে পারবেন, মেঘদলের ‘এ হাওয়া’ গানটা আর ‘হাওয়া’ সিনেমার গল্প দুটো সম্পূর্ণ আলাদা একটা ব্যাপার। কোনোটার সঙ্গে কোনোটার মিল নেই।

তবে একটা জায়গায় ব্যাপারটার মিল আছে। এটাকে ট্যালিপ্যাথি বলতে পারেন। মেঘদলের ‘এ হাওয়া’ ও ‘হাওয়া’ সিনেমা একই সময়ে তৈরি হওয়া একটা বিষয়। যেমন, শিবু যখন গানটা লিখে তখন সুমনের হাওয়ার শুটিং চলে। দুজনের কেউই দুজনের গান বা চিত্রনাট্য সম্পর্কে জানতো না। খুবই কাকতালীয়ভাবে এটা মিলে গেছে। শিবু যখন গানটা করছিল তখন আমার মনে হচ্ছিল আমি এর আগে কোথাও গানটা শুনেছি। কিন্তু আমি গানটা আগে শুনবো কীভাবে? এ গান তো কোথাও ছিল না। 

এটা আসলে আমাদের প্রথম অ্যালবামের যে অ্যালবাম স্লিপ, যেটায় প্রত্যেকের যে একটা ব্যক্তিগত অনুভূতি থাকতো সেখানে শিবুর লেখা, ‘রাত্রির ট্রেন করুণ শঙ্খের মতো, মায়ের মুখে প্রথম শোনা গান’ লাইনগুলো ছিল। ও তখন ওই লাইনগুলো পিক করে এই গানটা বানিয়েছে। যেটার নাম হলো, ‘এ হাওয়া’। ঠিক তখনই সুমন সিনেমা বানাচ্ছে, যে সিনেমার নাম ‘হাওয়া’। একই সময়ে ব্যাপারটা মিলে যাওয়ায় পরবর্তীকালে আমরা এই গানটাকে ক্যাম্পেইন সং হিসেবে চালিয়ে দিয়েছি।

পুরো সিনেমায় আবহসংগীতে কাজ করার অভিব্যক্তিটা জানতে চাইলে তিনি বলেন, সিনেমা সব ক’টা আর্টের সবচেয়ে বড় মাধ্যম। কেননা, সিনেমাটা হলো ব্যাপক কর্মযজ্ঞের একটা ব্যাপার। হাজারটা জিনিস মিলে তৈরি হয় একটা সিনেমা। হাওয়ার শুটিং থেকে শুরু করে মুক্তির আগ পর্যন্ত প্রায় তিন বছরের জার্নির মধ্যে আমি মিউজিকের কাজ শুরু করেছি দীর্ঘ দুই বছর ধরে। ২০২০ সালের জুলাই-আগস্টের দিক থেকে শুরু করে এখন ২০২২ সালের জুলাই। এই দীর্ঘ সময়ের জার্নিতে অনেক চড়াই-উতরাই পার করে আজকে এই জায়গায় এসেছি। 

সিনেমার আবহসংগীত দশর্কদের মনে কতটুকু প্রভাব ফেলতে পারে এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পুরো সিনেমাটায় আমি আবহসংগীতের কাজ করেছি। আবার এই সিনেমার সাউন্ড ডিজাইনারও আমি ছিলাম। ফাইনাল সাউন্ড মিক্সিং ও মাস্টারিংটাও আমারই করা। আমি আমার কম্পোজ করা মিউজিক ফাইনালি সবকিছুর সঙ্গে আমিই মিক্স করেছি। ডায়লগসহ সবকিছুই। বলতে পারেন সাউন্ড ডিজাইনার ও রেকর্ডডিং মিক্সারের দায়িত্বটাও ছিল আমার। ফাইনালি আমার হাত ধরেই হাওয়া সিনেমাটা, সিনেমা হলে যাচ্ছে। সুতরাং বলতে পারেন, আমি পুরোটাই জানি। যার ফলে আমি আমার নিজের মিউজিককেও জাজ করতে পারছি। 

এমনও হয়েছে যে আমি মিউজিক করেছি, যার ছয়-সাতটা লেয়ার আবার আমি নিজেই ফেলে দিয়েছি। সাউন্ড ডিজাইনার হিসেবে ফেলে দিয়েছি। আবহসংগীত করার সময় যে মিউজিক করেছিলাম, সাউন্ড ডিজাইনার হিসেবে বসার পর মনে হয়েছে এই মিউজিকের দরকার নেই। তখন মিউজিকটা ফেলে দিয়েছি। আমার বহুকষ্টে করা মিউজিক আমি নিজেই ফেলে দিচ্ছি ব্যাপারটা কি যে কষ্টের তা বলে বোঝানো যাবে না। তারপরও সিনেমার প্রয়োজনে তা ফেলতে হয়েছে।

আমরা আসলে অতিরিক্ত মিউজিক একদমই করতে চাইনি। যেটা সাউন্ডেই পারপাস সার্ভ হচ্ছে সেখানে আলাদা করে মিউজিকের তো দরকার নেই। এভাবে প্রিভিউয়ের পর প্রিভিউ করে খুবই নির্মমভাবে নিজের কাজকে জাজ করার কাজটা প্রোফেশনাল ওয়েতে করে গেছি। আসলে সিনেমাটার সঙ্গে মিউজিক এতো গভীরভাবে মিলেমিশে আছে যে, যার ছবিটা ভালো লাগবে তার সবকিছুই ভালো লাগবে। আর যার ছবিটা ভালো লাগবে না, সে বাকি বিষয় সেভাবে খেয়ালই করবে না। 

আরও পড়ুন: প্রচারণার হাওয়ায় উড়ে ‘হাওয়া’ বুয়েটে

একজন সাধারণ দর্শক হিসেবে মতামত জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার মনে হয়, সিনেমা বানানোর গল্প নিয়েই আসলে অনেক দুর্ধর্ষ সিনেমা হতে পারে। সে গল্পে না যাই। আসলে ব্যান্ড হিসেবেও আমার হাওয়ার সঙ্গে থাকা হয়েছে। সব কিছু মিলিয়ে এটা একটা দারুণ অভিজ্ঞতা আমার জন্য। আমরা যে যার জায়গা থেকে সেরা কাজটা দেয়ার চেষ্টা করেছি। এখন দর্শক সেটার যথাযথ মূল্যায়ন করলেই কষ্টটা সার্থক হবে।

তাছাড়া আমি বাংলা সিনেমার একজন নিয়মিত দর্শক। তাই আমি যদি এই সিনেমায় কাজ না-ও করতাম তাহলেও আমার সিনেমাটা ভালো লাগতো। আমি সিনেমা হলে গিয়ে যে অনুভূতিটা পেতাম, সেটা আমাকে উত্তেজিত করতো। এবং আমি আশাবাদী, অনেক যত্ন নিয়ে, সময় নিয়ে, বুঝে শুনে করা এই কাজ মানুষের মনে জায়গা করবে এবং হাওয়া মানুষকে হাওয়ার সাগরে ভাসাতে সক্ষম হবে।

]]>
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url