কোরবানির জন্য কেন কিনবেন দেশি গরু


July 04, 2022 at 06:00AM
from somoynews.tv | RSS Feed

ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় কোরবানি হলো, জিলহজ মাসের ১০ তারিখ সকাল থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্তের পূর্বপর্যন্ত আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট পশু জবাই করা। সে হিসেবে আগামী ১০ জুলাই (রোববার) মুসলমানদের দ্বিতীয় প্রধান ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহা পালিত হতে যাচ্ছে।

আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টিলাভে সামর্থ্যবান মুসলমানরা এ দিন পশু কোরবানি দিয়ে থাকেন।

দেশি-বিদেশি নানা জাতের গরু নিয়ে ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে কোরবানির পশুর হাট। আমাদের দেশে কোরবানির জন্য সবচেয়ে আকর্ষণীয় পশু হলো গরু। আর গরুর মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো দেশি গরু। বিগত কয়েক বছর ধরেই মূলত দেশের বাজারে এর চাহিদা বেড়েছে। যার অন্যতম কারণ দামের সহনশীলতা। 

দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি ও বর্তমান বাজারে অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতি হওয়ায়; গরু কেনার ক্ষেত্রে সবাই তাদের সামর্থ্য মোতাবেক কোরবানি দেয়ার চেষ্টা করে থাকেন। তবে সবারই প্রথম পছন্দ থাকে গরু কোরবানি দেয়ার। এক্ষেত্রে বাজারে বিদেশি গরুর থেকে দেশি গরু তুলনামূলক কমে পাওয়া যায়। তাছাড়া ভারতীয় গরু না থাকায় দেশি গরুর চাহিদাও বেড়েছে। 

এদিকে, সরকারও দেশি গরুর নানা জাত নিয়ে গবেষণা করছে, যাতে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে এসব জাতের গরুর উন্নয়ন ও সংখ্যা বাড়ানো যায়। ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে বছরজুড়ে বাংলাদেশে বহু খামারি পশু পালন করে থাকেন। আর কোরবানির সময়ে বাজারে গিয়ে ক্রেতাও নাদুসনুদুস ও মানে সেরা গরুটাই খোঁজ করেন। এক্ষেত্রে দেশি গরুকে সবচেয়ে ভালো হিসেবে দেখা হয়।

আরও পড়ুন: পশু কোরবানির প্রস্তুতি ও করণীয়

কোরবানির জন্য কেন কিনবেন দেশি গরু

কোরবানির জন্য দেশি গরু কেনার প্রসঙ্গে Indigenous Livestock Breeds of Bangladesh এর ফেসবুক গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা আহমেদ বখতিয়ার নাফিসের সঙ্গে সময় সংবাদের কথা হলে তিনি জানান, আমাদের দেশে অধিকাংশ কোরবানিদাতার সামর্থ্য দেখা যায় ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার মধ্যে। অথচ এ দামে বাজারে খুব একটা গরু পাওয়া যায় না। যার ফলে বড় আকারের গরুর চাইতে ছোট আকারের গরুর দাম মণ প্রতি বেড়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে যদি দেশে গ্রাম পর্যায়ে প্রজননের মাধ্যমে দেশি গরুর উৎপাদন বাড়ে তাহলে কোরবানির সময় বাজারে দামের যে অসামঞ্জস্যতা তৈরি হচ্ছে তা আর থাকবে না। পাশাপাশি স্বল্প দামেও তখন বাজারে কোরবানির গরু পাওয়া যাবে।

তিনি আরও বলেন, কোরবানির জন্য দেশি গরু কেনা হলে সে টাকাটা বাহিরে কোথাও চলে যাবে না। যা আমাদের দেশেই থেকে যাবে। উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত ব্যাক্তিদের সময় ও পরিশ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন হবে। এতে ব্যাপারি ও খামারিরা লাভবান হয়ে পরবর্তীতে দেশি গরুর উৎপাদন বৃদ্ধিতে উদ্বুদ্ধ হবেন। যার ফলে আমাদের অর্থনৈতিক চাহিদা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পাবে। যা আমাদের দেশের জন্যই উপকারী হিসেবে কাজ করবে। 

গরুর বাজারের চড়া দামের কারণে, সাধারণত যাদের মধ্যবিত্ত শ্রেণী হিসেবে তুলনা করা হয়; তারাই কোরবানির বাজারে এসে নিম্নমধ্যবিত্ত পর্যায়ে পড়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে তার পছন্দ সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। সে যেটাই পাবে সেটাই কিনবে। কেননা, তাকে কোরবানি তো দিতেই হবে। তাই দেশি গরুর উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে তখন আর এ সমস্যাটা থাকবে না বলেও জানান নাফিস।

আর দেশি গরু কেনার পেছনে সবচেয়ে বড় যে বিষয়টা কাজ করে তা হলো, দেশি গরুর স্বাদ বিদেশি গরু থেকে অনেক বেশি হয়ে থাকে। এতে চর্বি কম থাকে, মাংসের পরিমাণ বেশি হওয়ায় এর চাহিদা ব্যাপক। আর এ জন্য কোরবানি দাতাদের দেশি গরু কেনার দিকে বেশি মনোসংযোগ দেয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।

বর্তমান বাজারে দেশি গরু পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া গেলেও এর দাম তুলনামূলক বেশি দেখা যাচ্ছে। এর কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে দুটো। এক, চাহিদার তুলনায় দেশি গরুর উৎপাদনে এখনো কিছুটা ঘাটতি থাকা। দুই, ব্যাপারীরা অসাধু উপায়ে ন্যায্য দামের চাইতে বেশি দাম বাড়িয়ে দেয়া। 

দেখা যায়, গ্রামের খামারি থেকে যে দামে কেনা হচ্ছে তারচেয়ে অনেক বেশি দামে ব্যাপারীরা কোরবানির বাজারে দাম হাঁকাচ্ছেন। এমনকি এতে প্রকৃত খামারিও তার ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। যা তাকে উৎপাদনের ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত করছে। তাই এক্ষেত্রে সরকার যদি কোনো বিধিমালা প্রয়োগ করেন তাহলে তা স্বাভাবিক স্থিতিতে আসবে বলে তার ধারণা। এতে প্রকৃত খামারিরা লাভবান হবেন।

আহমেদ বখতিয়ার নাফিসের এ ফেসবুক গ্রুপ, দেশের একমাত্র গ্রুপ যারা কিনা; দেশীয় প্রজাতির সব গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগির প্রজনন ও সংরক্ষণে সচেতনতা সৃষ্টিতে কাজ করে। এবং সরকারের এসব বিষয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক প্রকার যোগাযোগের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি বিভিন্ন ম্যাটারিয়াল ও নিয়মনীতি খামারি, কৃষক ও চাষীদের মাঝে অনলাইনের মাধ্যমে পৌঁছে দেয়ার কাজ করে। ২০১৮ সালের শেষ দিকে শুরু হওয়া এই গ্রুপ এখন দেশীয় পশু কেনা-বেচার মার্কেটপ্লেস হিসেবে কাজ করছে। যা দেশের পশুশিল্পে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে।

দেশি গরুর চাহিদা কিভাবে বেড়েছে?

বাংলাদেশে যত পশু কোরবানি হয়, একটা সময় তার বড় অংশ আসতো প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে। কিন্তু ২০১৪ সালে ভারতে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশে গরু আসা বন্ধে সীমান্তে কড়াকড়ি করা হয়। এক পর্যায়ে বাংলাদেশে দেশীয় পর্যায়ে মাংসের চাহিদা পূরণ নিয়ে সংশয় তৈরি হয়।

আরও পড়ুন: কোরবানির বিধিবিধান ও পশু বাছাইয়ের নিয়ম

সেসময় দেশীয় মাংসের চাহিদা পূরণে (বিশেষ করে কোরবানির সময়কার চাহিদা পূরণে) সরকার ব্যাপকভাবে দেশীয় গরুর জাত উন্নয়নে মনোযোগ দেয়। প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের 'বিফ ক্যাটল ডেভেলপমেন্ট' নামে একটি প্রকল্প রয়েছে যার মাধ্যমে ভিন্ন জাতের উচ্চ-ফলনশীল গরুর সঙ্গে দেশি জাতের গরুর সংকরায়নের চেষ্টা করে দেশি গরুর প্রজনন বৃদ্ধি করছে। 

সরকারি গবেষণাগারের গবেষণায় মাংস এবং দুধের পরিমাণ দুই-ই বাড়ানোর দিকে জোর দেয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে গত দুই দশকে দেশে কৃষি খামারের সংখ্যাও অনেক বেড়েছে, যেখানে দেশি জাতের গরু উৎপাদন করা হচ্ছে।

কিভাবে চিনবেন কোনটি দেশি গরু?

সাধারণভাবে দেশি গরু বিদেশি জাত বা সংকর জাতের চেয়ে আকারে কিছুটা ছোট হয়। দেশি জাতের গরুর শরীরে চর্বি কম থাকে। মাংসে স্বাদ বেশি হয়, কিন্তু দুধের পরিমাণ বিদেশি গরুর তুলনায় কম হয়। কোরবানির সময় মানুষ সাধারণত বেশি মাংস হবে এমন জাতের গরু-ই খোঁজেন। 

দেশি গরুর মাংসের স্বাদ বিদেশি গরুর চেয়ে ভালো। তবে অনেকে বিদেশি গরুকে দেশি গরু ভেবে প্রতারিতও হন। তাই দেশি গরু চেনার জন্য মানুষের আগ্রহ এবং কৌতূহলের শেষ নেই।

যেহেতু দেশি জাতের জনপ্রিয়তা বাড়ছে, ফলে দেশি জাত কিভাবে চেনা যায়, সে প্রশ্ন অনেকের মধ্যেই দেখা যায়। দেশি গরুর মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এরা ছোট ও মাঝারি আকৃতির। এ ছাড়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেশি গরু এক রঙের হয়। এ জাতের গরুর চামড়া শক্ত থাকে, কুঁজ থাকে এবং গলার নিচে চামড়ার ভাঁজ কম থাকে। এদের পা চিকন ও শিং বড় হয়। গায়ের লোম ছোট এবং দেহ চকচকে হয়। চামড়া শক্ত থাকে।

আমাদের দেশে মূলত পাঁচ ধরনের দেশি গরু পাওয়া যায়। তার মধ্যে মুন্সিগঞ্জের মীরকাদিম ও চট্টগ্রামের রেড চিটাগাং ক্যাটল অন্যতম। এছাড়াও রয়েছে স্থানীয় দেশি জাতের গরু, পাবনা ক্যাটল ও নর্থ বেঙ্গল গ্রে। 

এসব প্রজাতির বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে চলুন কিছুটা জেনে নেয়া যাক:

মীরকাদিমের ধবল গাই

নগরকেন্দ্রিক ঈদের হাটে কোরবানির জন্য মুন্সীগঞ্জের মীরকাদিমের ধবল গাই বেশ জনপ্রিয়। এই গরুর চাহিদা ব্যাপক। এটি আকারে সাধারণ গরুর চেয়ে বড়। 

এই গরুর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি সাদা রঙের হয়ে থাকে। তবে কখনো হালকা ছাই রঙেরও দেখা যায়। এটি পালনে খাবারের খরচ কম লাগে। খৈল, গম, মসুর ডালের ভুসি এবং ভুট্টা গুঁড়ার মত খাবার দিয়েই পালন করা যায়। মীরকাদিমের গরুর মাংসে আঁশ কম থাকে, এর হাড় চিকন হয়। ফলে মাংস হয় নরম ও তেলতেলে।

রেড চিটাগাং ক্যাটল

দেশি আবহাওয়া সহনশীল বলে খামারিদের কাছে বেশ জনপ্রিয় চট্টগ্রামের রেড চিটাগাং ক্যাটল। মূলত এই জাত চট্টগ্রাম এবং এর আশেপাশের জেলায় বেশি উৎপাদন হয়। এই গরুর গায়ের রং লাল। এর ক্ষুরা মানে পায়ের রঙ লাল। এটি আকারে মাঝারি, এবং এর কুঁজ ছোট আকারের হয়। এই গরু পালনে খাবার কম লাগে। 

সরকার যেসব দেশি জাত নিয়ে গবেষণা করছে, তার মধ্যে এই রেড চিটাগাং ক্যাটলকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। এর কারণ এ গরু কেবল চট্টগ্রাম ও পার্বত্য জেলা নয়, দেশের অন্য যেকোনো জায়গাতেই পালন করা সম্ভব। সে কারণে এই জাত উন্নয়নের চেষ্টা করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন: কোরবানির পশু নিয়ে যা করবেন না

পাবনা ক্যাটল

বাংলাদেশের জাতীয় তথ্য বাতায়নে পাবনা ক্যাটল সম্পর্কে বলা হয়েছে, পাবনার চলনবিল সংলগ্ন এলাকায় এই গরুর বাস। এটি পাবনা ব্রিড নামেও পরিচিত। মাঝারি আকৃতির এই জাতের গরু সাদা বা সাদা মেশানো ছাই রংয়ের হয়ে থাকে। এছাড়া লাল, ধূসর বা মিশ্র বর্ণেরও হয়। দেশীয় আবহাওয়া সহনশীল এসব গরু পালনে খাবার কম লাগে।

এদের স্বাস্থ্য সুঠাম, রোগব্যাধি কম হয়। এটি ঘাস খায়, এর বাইরে অন্য ধরনের খাবার কমই দিতে হয়। গত কয়েক বছর ধরে দেশে দুধের উৎপাদন বাড়াতে ফ্রিজিয়ান গরুর সঙ্গে এর কৃত্রিম প্রজনন করা হচ্ছে।

নর্থ বেঙ্গল গ্রে

আমাদের দেশের উত্তরাঞ্চলে নর্থ বেঙ্গল গ্রে গরুর দেখা মেলে। এর গায়ের রং সাদা বা গাঢ় ধূসর এবং সাদা রঙের মাঝামাঝি যেকোনো রঙের হতে পারে। পূর্ণবয়স্ক পুরুষ গরুর ঘাড়ে ছাই রঙের ছোপ দেখা যায়। মুখ, চোখের পাতা ও খুর কালো রঙের হয়ে থাকে। তবে লেজের প্রান্ত সাদা রঙের হয়। গরুর শিং ছোট বা মাঝারি আকারের হয়ে থাকে এবং শিং ভেতরের দিকে বাঁকানো থাকে। 

স্থানীয় দেশি জাতের গরু

এ জাতের গরু দেশের সবখানে পাওয়া যায়। এ গরু আকারে ছোট হয়। এর কুঁজ সুগঠিত থাকে। গলার নিচের চামড়া বেশ বিকশিত থাকে। প্রাপ্তবয়স্ক ষাঁড়ের গলার নিচের চামড়া ঝুলে থাকে। কান লম্বা এবং পাতার মতো ভাঁজ হয়ে থাকে। এদের শিং বাঁকানো থাকে। গায়ের রং লাল, সাদা, কালো, ধূসর বা ছাইরঙা কিংবা দুই বা ততোধিক রঙের মিশ্রণও হতে পারে। এদের উচ্চতা তিন থেকে সাড়ে তিন ফুট পর্যন্ত হয়ে থাকে। 

]]>
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url