পতাকার ব্যবহার-অপব্যবহার
December 12, 2021 at 05:05AM
from somoynews.tv | RSS Feed
জাতীয় পতাকার সম্মান রক্ষার আইনি বিধানের সমান্তরালে রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা জারি হয় মাঝেমধ্যেই। চলতি বছরের শুরুতেও একটি সতর্কতা জারি হয়েছিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে। এতে জেলা পর্যায়ে জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠানে ইউনিফর্মধারী ব্যক্তিরা জাতীয় পতাকার প্রতি যথাযথ সম্মান না দেখিয়ে জেলা প্রশাসকের সাথে পতাকা উত্তোলনে ব্যস্ত থাকায় উষ্মা প্রকাশ করা হয়। প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকে এমন সতর্কতা যথার্থতার সঙ্গে আন্তরিকতারও বার্তা দেয়। বার্তাটি বিশেষভাবে পুলিশকে লক্ষ্য করে। মুখে, প্রজ্ঞাপনে, আইনে থাকলেও দেশে জাতীয় পতাকার সম্মানের বাস্তবচিত্র বড় করুণ। পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রশাকধারীদের উপরোক্ত অসম্মান অন্যদের তুলনায় মামুলি। অসম্মানের পাশাপাশি পতাকার অপব্যবহারে রাজসম্মান হাতানোর ধরিবাজি প্রশাসন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষব্যক্তিরা ক্ষেত্রবিশেষে আরও বেশি করছেন। যে, যেদিক দিয়ে পারছেন তা সেরে ফেলছেন।
বিশ্বের কোনো কোনো দেশে জাতীয় পতাকা ছিঁড়ে বা ময়লা হয়ে গেলে চট করে একে ফেলে দেওয়া যায় না। পুড়িয়ে বা মাটি চাপা দেওয়া হয় অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে। তাও লোকচক্ষুর আড়ালে নিয়ে। জাতীয় পতাকার সাইজ, দিনক্ষণ, ওঠানো-নামানো, ঝুলানোসহ বিধিমালা পাকা-পোক্ত বাংলাদেশেও। কে-কারা, বাড়িতে-গাড়িতে, সামনে বা পেছনে কতো অংশে, কখন, কতোক্ষণ পতাকা বহনের অধিকারী সেই নির্দেশনাও পরিষ্কার। অন্য দেশের পতাকার সাথে বাংলাদেশের পতাকা তুলতে হলে কোনটা আগে, কোনটা পরে তাও ডানবামসহ নির্দিষ্ট করা আছে।
১৯৭২ সালের ফ্ল্যাগ রূলসে বাংলাদেশে পতাকা ব্যবহারের বিধিবিধানে একদম পরিষ্কার। ১৯৭২-এর বিধি ৪-এর ১ অনুসারে, নির্দিষ্ট উপলক্ষে বাংলাদেশের সর্বত্র সরকারি ও বেসরকারি ভবন এবং বিদেশে কূটনৈতিক মিশনের অফিসে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন হয়। বিধি ৬-এর ৩ অনুসারে রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রী তাদের মোটরযান, জলযান এবং উড়োজাহাজে ‘বাংলাদেশের পতাকা’ উত্তোলন করার অধিকারী। ৬ (৪) অনুসারে, মোট ৮ শ্রেণির ব্যক্তিবর্গ তাদের মোটর গাড়ি ও জলযানে ‘বাংলাদেশের পতাকা’ উত্তোলন করার অধিকারী। তারা হলেন- (ক) জাতীয় সংসদের স্পিকার; (খ) প্রধান বিচারপতি; (গ) মন্ত্রীবর্গ; (ঘ) চিফ হুইপ; (ঙ) সংসদের ডেপুটি স্পিকার; (চ) সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা (ছ) মন্ত্রীর পদমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ; (জ) বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের কূটনৈতিক/কনস্যুলার/মিশনের প্রধান। এবং সর্বশেষ বিধি ৬(৫) অনুসারে প্রতিমন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ, উপমন্ত্রী এবং উপমন্ত্রীর পদমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ রাজধানীর বাইরে দেশের অভ্যন্তরে অথবা বিদেশে ভ্রমণকালীন তাদের মোটরযান এবং জলযানে ‘বাংলাদেশের পতাকা’ উত্তোলনের অধিকারী হবেন।
বিজয়ের ডিসেম্বর বা স্বাধীনতার মার্চ মাসে আবেগে, হুজুগে, অজ্ঞতায়, মতলবে বা বাহাদুরির শো-ডাউনে যত্রতত্র-যথেচ্ছা জাতীয় পতাকার অবমাননা অনেকটা গা সহার পর্যায়ে চলে এসেছে। পোশাকে জাতীয় পতাকা বা জাতীয় পতাকা দিয়ে পোশাক বানানোর পাগলামিও পুরনো। ভক্তি দেখাতে গিয়ে ফ্যাশানেবল হয়ে যা প্রকারান্তরে জাতীয় পতাকার অপমানই নিশ্চিত করছে। এ নিয়ে ডাকদোহাই না মানার সংস্কৃতিও সহ্য করতে হচ্ছে। নইলে না দেখার ভান ধরে নিজেকে নিবৃত রাখতে হচ্ছে। বিধিমালায় বা আইনত জাতীয় পতাকা প্রদর্শন ও উত্তোলন যে অবাধ নয়, সীমিত-তা বোঝার বোধও নেই অনেকের। এই শ্রেণির বিষয়টা ভিন্ন। আসল গোলমালটাও অন্যখানে। জেনে-বুঝেও পতাকা ওড়ানোর অধিকারটির দিকে কারো কারো লোভাতুর মানসিকতাই সমস্যার মূল কারণ। গুরুত্ব বা পর্যায় বিবেচনায় প্রজাতন্ত্রের অল্প কিছু আমলা-কর্মকর্তা পতাকা ব্যবহারের অধিকার রাখলেও বাস্তবে সরকারি ইস্যুকৃত গাড়িতে সমানে পতাকা-স্ট্যান্ড ব্যবহার হচ্ছে। রাজসম্মান বা ক্ষমতার জানান দেওয়ার রোগটি নিয়ে মাঝেমধ্যে কথা হলেও পরে আরেক ইস্যুতে মিলিয়ে যায়। পরিস্থিতির অনিবার্যতায় নির্বাচন কমিশনারদের নিজেদের প্রাধিকারসংক্রান্ত আইনের খসড়া থেকে জাতীয় পতাকা ব্যবহারের বিষয়টি বাদ দেয়া আলোচিত ও প্রশংসিত হয়েছিল। আরো কিছু কমিশন ও প্রতিষ্ঠানে এখনো ফয়সালা আসেনি। বিধিবিধানের চেয়ে তারা রেওয়াজ বা দাপ্তরিক নোটকে বেশি গুরুত্ব দিতে পছন্দ করেন।
আরও পড়ুন: ‘যারা পাকিস্তানি পতাকা উড়িয়েছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা’
সময়ে-সময়ে বিধিমালার নানা ব্যাখ্যা, রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক নির্দেশনা, ক্ষমতার বাহাদুরি, সমপর্যায় নির্ণয় বা আরোপে কেউ কেউ গোলমাল চর্চার সুযোগ হিসেবে নেন। সেখানে বিধিবিধানের চেয়ে যুক্তিকে প্রধান করে তোলা হয়। অথবা চুপ মেরে থাকা বা এড়িয়ে যাওয়া। সচিবদের গাড়িতে পরিচিতি ফলক সংযোজনের বিষয়ে যুক্তি হচ্ছে- পরিচিতি ফলক না থাকলে তারা রাষ্ট্রীয় ও সরকারি অনুষ্ঠানে বিব্রতকর অবস্থায় পড়েন। কেবল বঙ্গভবনে স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানের কথাই ধরা হলে গাড়ি পার্কিংয়ের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পায় পতাকাবাহী ও তারকাচিহ্নিত গাড়ি। আর জাতীয় পতাকা ছাড়া আগে শুধু সুপ্রিম কোর্টের পতাকা ব্যবহার করতেন বিচারপতিরা। তাছাড়া প্রতিরক্ষা বাহিনী কমান্ড পদগুলোতে থাকা কর্মকর্তাদের পতাকা ব্যবহারের প্রতিষ্ঠিত রেওয়াজ আছে। বিদেশি রাষ্ট্রদূত ও উন্নয়ন-সহযোগী সংস্থার প্রধানেরাও ব্যবহার করেন তাদের পতাকা। এমপিদের গাড়িতেও আলাদা মনোগ্রাম থাকে। স্বায়ত্তশাসিত বিভিন্ন সংস্থার প্রধানও তাদের প্রতিষ্ঠানের পতাকা গাড়িতে লাগিয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এতো পতাকা ও তারকাখচিত গাড়িতেই ভর্তি হয়ে যায় বঙ্গভবনের ভেতরের আঙিনা। সচিবদের গাড়িসহ অন্য সব গাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয় এর বাইরে। অনুষ্ঠান শেষে গাড়ি পেতে কোনো কোনো সচিবের বেগ পেতে হয়।
ভিআইপি সুবিধার একটা বিশেষ স্থল হচ্ছে বিমানবন্দর। সেখানকার ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহারের মোহ ধরে রাখা কঠিন। ভিআইপির ধারেকাছে নন, এমন ক্ষমতাবানও বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহারে দুনিয়ার অন্যতম সুখ ভোগ করেন। সরকারি যানবাহনে অপ্রয়োজনীয় পতাকা-স্ট্যান্ডকে মানুষ সম্মানের চোখে দেখছে না। বরং নানা টিপ্পনি কাটে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিশেষ করে ট্রাফিক পুলিশকে ফেলছে বাড়তি ভোগান্তিতে। তাদের পক্ষে ধরে ধরে পতাকা-স্ট্যান্ডবাহি গাড়ি চেক করা অসম্ভব। জিজ্ঞাসা করা সম্ভব নয় গাড়ির আরোহীর প্রকৃত পরিচয়। তা শিষ্টাচারেই পড়ে না। তারওপর এসব গাড়িকে আইনত প্রটোকল দিতে বাধ্য তারা। দিচ্ছেনও। পতাকা বা স্ট্যান্ডযুক্ত গাড়িকে তাজিম দিতে গিয়ে সড়কের অন্যদিকে কী হাল হয়, সেটা খেয়ালের সময়ই হয় না।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন
]]>